কম্বোডিয়ার সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে আরও ৭৮ বাংলাদেশি ফিরলেন, ৪ দিনে মোট ফিরলেন ২২১ জন
কম্বোডিয়ার বিভিন্ন সাইবার স্ক্যাম সেন্টার বা প্রতারক চক্রের বন্দিশালা থেকে উদ্ধার হওয়া আরও ৭৮ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। মঙ্গলবার দিবাগত রাতে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে তারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান।
এ নিয়ে গত চার দিনে কম্বোডিয়ার বিভিন্ন স্ক্যাম সেন্টার থেকে মোট ২২১ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরলেন।
এর আগে ১২ জুন ৩৭ জন, ১৩ জুন ৫৪ জন এবং ১৫ জুন ৫২ জন ভুক্তভোগী কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফেরেন।
ফেরত আসা বাংলাদেশিদের জন্য বিমানবন্দরে সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটির সাথে মিলে জরুরি সহায়তা ও বাড়িতে পৌঁছানোর জন্য অর্থ সহায়তা দিয়েছে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, ভালো চাকরির কথা বলে বিদেশে নিয়ে এসব বাংলাদেশিকে স্ক্যাম সেন্টারে জিম্মি করা হতো। এরপর তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে অনলাইনে নানা প্রতারণামূলক কাজে বাধ্য করা হতো।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশের নাগরিকদের টার্গেট করে এসব সাইবার প্রতারণা চালানো হতো। আর প্রতারণার নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে এই বাংলাদেশিদের ওপর চলত অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
সম্প্রতি কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের কারণেই এসব বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে বলে জানান শরিফুল হাসান।
ইতিমধ্যে ফেরত আসা বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী এ ঘটনায় মামলা করেছেন।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে ১৫ হাজার ৯২১ জন কর্মী চাকরির উদ্দেশ্যে কম্বোডিয়া গেছেন। কিন্তু ফেরত আসা বাংলাদেশিরা জানিয়েছেন, হাজার হাজার কর্মী সেখানে চাকরি না পেয়ে অত্যন্ত মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
অথচ বিদেশ যাওয়ার আগে তাদেরকে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখানো হয়েছিল।
ফেরত আসা এক ভুক্তভোগী জানান, দালাল তাকে বলেছিল কম্বোডিয়ায় সরাসরি কোম্পানিতে চাকরি হবে। সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে বিএমইটির ছাড়পত্র দিয়েই তাকে কম্বোডিয়া পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাকে এক মাসের ভিজিট ভিসা দেওয়া হয়। এরপর দালালরা আর কোনো ভিসা দেয়নি এবং সেখানে কোনো কোম্পানিরও খোঁজ পাননি তিনি।
ওই ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, কম্বোডিয়ায় থাকা রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতিনিধিরা পরে টাকার বিনিময়ে তাকে স্ক্যাম চক্রের কাছে বিক্রি করে দেন।
আরেক ভুক্তভোগী জানান, তাদের শারীরিক নির্যাতন করে স্ক্যাম সেন্টারে কাজ করতে বাধ্য করা হতো। কাজ করতে রাজি না হলে টর্চার সেলে নিয়ে নির্যাতন এবং ইলেকট্রিক শক দেওয়া হতো।
তিনি জানান, সম্প্রতি কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী স্ক্যাম সেন্টারগুলোতে অভিযান চালালে চীনা অপরাধীরা পালিয়ে যায় এবং তারা মুক্তি পান।
এর আগে গত ২২ জানুয়ারি মিয়ানমারের একটি সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে আটজন এবং ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ১৮ জন বাংলাদেশি দেশে ফেরেন। ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে থাইল্যান্ডের সীমান্ত এলাকা মায়ে সট হয়ে জোর করে তাদের মিয়ানমারে ঢোকানো হয়েছিল।
সেখানে পৌঁছানোর পরই তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। ভয়াবহ নির্যাতন করে তাদের দিয়ে নানা ধরনের সাইবার জালিয়াতির কাজ করানো হতো।
ব্র্যাক জানিয়েছে, অপরাধী চক্রগুলো কম্পিউটার ও কলসেন্টার অপারেটরসহ বিভিন্ন পদে আকর্ষণীয় বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে অনলাইনে (ভুয়া ওয়েবসাইট, ই-মেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ইত্যাদি) ব্যাপক প্রচার চালায়। এরপর সুকৌশলে তরুণদের স্ক্যাম সেন্টারে নিয়ে গিয়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে স্ক্যামের কাজে বাধ্য করে।
তাই থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় যাওয়ার বিষয়ে সবাইকে সতর্ক ও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
