শিক্ষক ও অবকাঠামো সংকটে ওবিই বাস্তবায়নে হোঁচট খাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪টি বিভাগে আংশিকভাবে আউটকাম বেজড এডুকেশন (ওবিই) কারিকুলাম চালু হয়েছে। তবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, শিক্ষক সংকট, প্রশিক্ষণের অভাব এবং বড় আকারের শ্রেণিকক্ষের কারণে এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় ও শঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, জনবল ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ধাপে ধাপে ওবিই কারিকুলাম বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং সময়ের সঙ্গে এর সুফল দৃশ্যমান হবে।
৪৪ বিভাগে ওবিই চালু, ২০ বিভাগে প্রক্রিয়াধীন
ওবিই এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে পাঠ্যবিষয়ের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় নির্দিষ্ট কোর্স শেষে শিক্ষার্থীরা কী ধরনের দক্ষতা অর্জন করবে এবং সেই দক্ষতার মূল্যায়ন কীভাবে হবে—সেদিকে। এর মাধ্যমে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের পাশাপাশি মানবিক গুণাবলি, প্রায়োগিক দক্ষতা, যোগাযোগ সক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জনের ওপর জোর দেওয়া হয়।
সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০২০ সালে ওবিই কারিকুলাম চালুর সুপারিশ করে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের দপ্তর থেকে পাওয়া গত মে মাসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪টি বিভাগে আংশিকভাবে ওবিই কারিকুলাম চালু রয়েছে এবং আরও ২০টি বিভাগে এটি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলছে। বাকি বিভাগগুলোতে এখনো এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩টি অনুষদের অধীনে ৮৪টি বিভাগ এবং ১৩টি ইনস্টিটিউট রয়েছে। এর মধ্যে কলা ও চারুকলা অনুষদের অধিকাংশ বিভাগে ওবিই চালু হয়েছে। বিপরীতে বিজ্ঞান ও আইন অনুষদের কোনো বিভাগেই এখনো এ কারিকুলাম চালু হয়নি। ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের মাত্র দুটি বিভাগে ওবিই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। অন্যান্য অনুষদে কিছু বিভাগে এটি চালু হয়েছে, আবার কিছু বিভাগে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
বিজ্ঞান অনুষদের উদ্বেগ 'জিইডি কোর্স' নিয়ে
বিজ্ঞান অনুষদের বিভাগগুলো বলছে, ওবিই কারিকুলামে নিজস্ব ডিসিপ্লিনের মূল কোর্সগুলোর বাইরে 'সাধারণ শিক্ষা উন্নয়ন' (জিইডি) কোর্সের জন্য অতিরিক্ত ক্রেডিট বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এতে মূল বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিজ্ঞান অনুষদের ডিন (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মো. মোফাজ্জল হোসেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'বিজ্ঞান অনুষদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা—ওবিই কারিকুলামে ২৫ শতাংশ জিইডি কোর্স আছে। ফলে অনার্সের বিষয়টাকে কম্প্রমাইজ করতে হবে। এক্ষেত্রে মাইনর বিষয় ছাড়াই ২৫ শতাংশ জিইডি কোর্স থাকলে মূল সাবজেক্ট দূর্বল হয়ে যাবে। এ জায়গাতে আমাদের কনসার্ন। ফলে এ কারিকুলামের বিষয়ে আমরা এখনও সিদ্ধান্তে যেতে পারিনি।'
চালু হওয়া বিভাগগুলোতে মিশ্র অভিজ্ঞতা
যেসব বিভাগে ওবিই কারিকুলাম চালু হয়েছে, সেসব বিভাগের বিভিন্ন অনুষদের অন্তত ছয়জন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেছে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড। তবে কারিকুলামটি নিয়ে তাদের অভিজ্ঞতা একরকম নয়।
প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শেফালী বেগম বলেন, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিভাগে ওবিই কারিকুলাম চালু করা হয়েছে। যেহেতু এটি সর্বশেষ ও হালনাগাদ কারিকুলাম, তাই তাদের অভিজ্ঞতা ইতিবাচক।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নাঈম সুলতানা।
তবে কিছুটা ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডার বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক শারমিন আহমেদ।
তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'আমাদের ৩টা ব্যাচ চলছে ওবিই কারিকুলামে। তবে এ কারিকুলামে ব্যবহারিক ক্লাস ও কোর্স সংখ্যা বাড়াতে হয়েছে। কিন্তু সে ধরনের ল্যাব ফ্যাসিলিটিজ আমরা দিতে পারছি না। আবার প্রেজেন্টেশন-অ্যাসাইনমেন্টের সংখ্যাও বাড়াতে হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের ওপর প্রচুর চাপ বেড়েছে।'
ওবিই কারিকুলামের লক্ষ্য ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর। তার মতে, এখানে যেভাবে কাজ করা হয়েছে, তা অনেকটা 'ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়া'র মতো।
তিনি বলেন, 'পুরোনো সিলেবাসকে নতুন কাঠামোয় উপস্থাপন করলে আসল কাজ হবে না। বরং আগে প্রতিটি বিভাগকে নিজেদের মতো কারিকুলাম বা লক্ষ্য তৈরি করতে হবে, তারপর সেই অনুযায়ী নতুন করে সিলেবাস সাজাতে হবে।'
কতটা কার্যকর হবে ওবিই
ওবিই কারিকুলাম নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত পাঁচটি অনুষদের ডিনের সঙ্গে কথা হয়েছে এ প্রতিবেদকের। তাদের অনেকেই অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় রিসোর্সের ঘাটতির কারণে বিদ্যমান বাস্তবতায় ওবিই বাস্তবায়নের কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বিশেষ করে যেসব বিভাগে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি, সেগুলোকে একাধিক সেকশনে ভাগ করা এবং সে অনুযায়ী শিক্ষকসংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন তারা। পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের ওপরও জোর দিয়েছেন। অন্যথায় ওবিই চালু হলেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হবে বলে মনে করেন তারা।
ওবিই কারিকুলাম বিষয়ে কর্মশালা আয়োজন এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব পালন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স সেল (আইকিউএসি)।
সেলটির পরিচালক অধ্যাপক ড. এম. রেজাউল ইসলাম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'কিছু সংকট রয়েছে। বিজ্ঞান অনুষদের বিভাগগুলো সেমিস্টার পদ্ধতিতে যেতে চায় না। আবার, ওবিই কারিকুলামে ক্লাসরুমের আকার ছোট করার কথা বলা হয়। ফলে এই অবকাঠামোগত কারণে ওবিই বাস্তবায়ন আমাদের এখানে সম্ভব না। ইউজিসিকে আমরা বহুবার বলেছি, কিন্ত তারা এখানে নজর দেয় না।'
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, 'ওবিই কারিকুলাম তৈরি করলাম, কিন্তু সেটার চর্চা করলাম না, ক্লাসে পড়ালাম না, প্রশ্নেও প্রতিফলন ঘটালাম না—তাহলে এর কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। এজন্য কার্যকর মনিটরিং ও সুপারভিশনের পাশাপাশি প্রয়োজন ফান্ডিং ও প্রশিক্ষণ। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবরেশন হচ্ছে কি না সেদিকেও নজর দিতে হবে।'
সক্ষমতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাগিদ
ওবিই বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একই ধরনের কাঠামো অনুসরণের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানভেদে সক্ষমতা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন শিক্ষাবিদরা। একইসঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত রিসোর্স এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন তারা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'শিক্ষক, ল্যাব, অবকাঠামো ও একাডেমিক সক্ষমতার দিক থেকে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় সমান অবস্থানে নেই। ফলে একটি অভিন্ন কাঠামো চাপিয়ে দেওয়ার বদলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাস্তবতা মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও দিকনির্দেশনা দেওয়া উচিত।'
তিনি আরও বলেন, 'একইসাথে আমাদের একাডেমিক পরিকল্পনা থাকতে হবে। প্রত্যেকটা বিভাগ এবং পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ থেকে ১০ বছর মেয়াদি একাডেমিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রয়োজন হলে ফ্যাকাল্টি সংখ্যা বাড়িয়ে, রিসোর্স বাড়িয়ে বা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমিয়ে সমন্বয় করতে হবে।'
'সময়ের সঙ্গে ফলপ্রসূ হবে ওবিই'
ওবিই কারিকুলাম বাস্তবায়নে জনবল ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করলেও ধীরে ধীরে এটি কার্যকর হবে বলে মনে করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'ওবিই কারিকুলামে যেভাবে বলা আছে সেভাবে আমাদের জনবল নেই। কিছু বিভাগে শিক্ষক সংকট রয়েছে, সেখানে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তবে কারিকুলামটা অনেক বিভাগে ভালোভাবে চলছে। এখন প্রাথমিক অবস্থায় আমরা শতভাগ ফল পাব না, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তা ফলপ্রসূ হবে।'
