চলতি বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই হাসপাতালগুলোতে বাড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গু রোগী সংখ্যাও। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। ফলে এবারও দেশজুড়ে ডেঙ্গু পরিস্থতি খারাপ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রস্তুতি এখনই শুরু করা প্রয়োজন—বিশেষ করে রাজধানীর বাইরে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২১ মে পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩ হাজার ১৭ জন, মারা গেছেন ৫ জন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার টিবিএসকে বলেন, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার 'ব্রুটো ইনডেক্স' (বিআই) ২০-এর বেশি পাওয়া যাচ্ছে, যা চলতি বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তিনি বলেন, 'আমরা ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় এডিসের ব্রুটো ইনডেক্স এখন ২০-এর বেশি পাচ্ছি। এ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, গত বছরের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি হতে পারে।'
ব্রুটো ইনডেক্স হলো প্রতি ১০০টি বাড়ি পরিদর্শনের পর সেখানে মশার লার্ভা পাওয়া যাওয়া পানির পাত্রের সংখ্যা পরিমাপক সূচক। কীটতত্ত্ববিদদের মতে, এই সূচকের মান ২০-এর বেশি হওয়া মানেই উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ।
কবিরুল বাশার বলেন, ঢাকার বাইরেও বেশ কিছু এলাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেশি।
তার মতে, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খুলনা, বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর, চাঁদপুর, ময়মনসিংহ, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন জেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে। এছাড়া ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলোও বেশি আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
জমে থাকা পানি অপসারণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাসহ অবিলম্বে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেন কবিরুল বাশার।
'জমে থাকা পানির কোনো ক্ষমা নেই। এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে এবং বর্জ্য পরিষ্কার রাখতে হবে,' বলেন তিনি।
এই কীটতত্ত্ববিদ আরও বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে, নইলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। গতানুগতিক ফগিং ও স্প্রে করে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। উৎস চিহ্নিত করে লার্ভা ধ্বংস করতে হবে। কিউলেক্স ও এডিস মশার জন্য আলাদা কর্মসূচি প্রয়োজন। একইসঙ্গে কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করা জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, চলতি বছর এ পর্যন্ত বরিশাল ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে সবচেয়ে বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এরপর ঢাকায় রোগী বেশি। যে পাঁচজন মারা গেছেন, তাদের মধ্যে তিনজন ঢাকার ও দুজন রাজশাহী ও চট্টগ্রামের রোগী ছিলেন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৮১ ডেঙ্গু রোগী ছিল। এর পর রোগী কমতে শুরু করে। আবার এপ্রিল থেকে রোগী বাড়তে শুরু করেছে। এপ্রিলে ৬৪০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। আর মে মাসের ২১ দিনে ৫৪৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং একজন মারা গেছেন।
১৯৬০-এর দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। তখন এটি 'ঢাকা ফিভার' নামে পরিচিতি পেয়েছিল। বাংলাদেশে ২০০০ সালের জুন থেকে অক্টোবরের মধ্যে প্রথমবারের মতো বড় আকারের ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ঘটে। এরপর থেকে প্রতি বছরই দেশে এই রোগের প্রাদুর্ভাব হচ্ছে।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপ শনাক্ত হয়েছে। ২০১০ সাল থেকে মূলত মে থেকে সেপ্টেম্বর মাসের বর্ষাকাল এবং অতিরিক্ত গরমের সময়েই ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যাচ্ছে।
২০১৯ সালে দেশে নতুন করে ডেঙ্গুর বড় ধরনের পুনরুত্থান ঘটে। এরপর ২০২২ ও ২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। ২০২৪ সালে দেশে ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় এবং ৫৭৫ জন মারা যান।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ড. বেনজীর আহমেদ টিবিএসকে বলেন, বৃষ্টির কারণে এখন এডিস মশার প্রকোপ বাড়তে পারে, বৃষ্টির এই সময়টা গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, 'এখন দরকার হলো সার্ভে করা। সার্ভে করে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে জোরদার কর্মসূচি নিলে ডেঙ্গুর মূল সিজন জুন-জুলাই-আগস্ট এই মাসগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমিয়ে রাখা যাবে। ঢাকা সিটি বা বড় বড় শহরগুলোতে মশক নিধন কর্মসূচি থাকলেও এবারের মূল চিন্তা ঢাকার বাইরের ডেঙ্গু নিয়ে।
বেনজীর আহমেদ বলেন, 'ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। গত বছর ঢাকার বাইরে ব্যাপক হারে ডেঙ্গু ছড়িয়েছে। তাই আমাদের ছোট পৌরসভা, গ্রামগুলোর দিকে নজর রাখতে হবে।'
তিনি সতর্ক করে বলেন, সময়ের সাথে সাথে ঢাকার ডেঙ্গু পরিস্থিতি যেভাবে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, ঠিক একইভাবে ঢাকার বাইরেও বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার আশঙ্কা দিন দিন বাড়ছে।
'আমাদের ওপর ডেঙ্গুর বড় আক্রমণ হবেই—এই বছর অথবা আগামী বছর। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাখতে সারা দেশে এডিস নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা, নির্মাণাধীন স্থাপনা ও পুরোনো ড্রামে পানি জমতে না দেওয়া, নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে,' বলেন তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশিদ টিবিএসকে জানান, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
'ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু ওয়ার্ড ও শিশু ওয়ার্ড প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নিয়মিত মিটিং হচ্ছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে,' বলেন তিনি।
চলতি মাসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম ও ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ২০ শয্যার ফিল্ড হাসপাতাল তৈরি করা হয়েছে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মশা নিধনে স্প্রে কার্যক্রমও জোরদার করার পাশাপাশি প্রতি শনিবার সারা দেশে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হচ্ছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন।
মন্ত্রী বলেন, 'চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধে জোর দিতে হবে। প্রতিরোধে জোর না দিলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।'
