ফুটওভারব্রিজ থাকলেও ভাঙা ডিভাইডার দিয়েই রাস্তা পারাপার, বাড়ছে প্রাণহানির ঝুঁকি
ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ফুটওভারব্রিজ থাকলেও তা ব্যবহার না করে ভাঙা সড়ক বিভাজক দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন অনেক পথচারী।
রাজধানীর বিভিন্ন ব্যস্ত এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক বিভাজক এখন পথচারী ও যানবাহনের জন্য অনিরাপদ শর্টকাটে পরিণত হয়েছে, যা বাড়িয়ে দিচ্ছে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় মাথার ওপর দিয়ে চলে গেছে একটি বড় ফুটওভারব্রিজ। অথচ তার ঠিক নিচেই দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। মাঝসড়কের লোহার বিভাজকের কয়েক জায়গায় বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে। সেই ফাঁক গলেই ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ।
কেউ শিক্ষার্থী, কেউ ক্রেতা, আবার কেউ অফিসগামী। পায়ের কাছ দিয়ে দ্রুতগতিতে ছুটে যাচ্ছে বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ি। তবুও জেব্রা ক্রসিং কিংবা ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার না করে ভাঙা ডিভাইডার দিয়েই পারাপার করছেন তারা।
সম্প্রতি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ অনেক সড়কের ডিভাইডার ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে আছে। কোথাও স্টিলের পাত উধাও, কোথাও বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে। সেই ফাঁক ব্যবহার করে পথচারীরা ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন। অনেক জায়গায় মোটরসাইকেলও উল্টো পথে চলাচল করছে।
সবচেয়ে বেশি অনিয়ন্ত্রিত পারাপার দেখা গেছে নিউমার্কেট, নীলক্ষেত ও ঢাকা কলেজসংলগ্ন এলাকায়। শিক্ষার্থী, ক্রেতা ও হকারদের চাপে পুরো এলাকায় প্রায় সারাক্ষণই ধীরগতিতে চলতে হচ্ছে যানবাহনকে। কোথাও যাত্রী ওঠানামার জন্য মাঝরাস্তায় গাড়ি থামানো হচ্ছে, কোথাও আবার ডিভাইডারের ফাঁক গলে রিকশা ও ভ্যান চলাচল করছে।
নিউমার্কেট এলাকায় রাস্তা পার হচ্ছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী শাহীন মিয়া। কেন ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার করছেন না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, "ব্রিজে উঠতে সময় লাগে। ডিভাইডারে ফাঁক থাকায় দ্রুত পার হওয়া যায়।"
একই কথা বলেন ঢাকা কলেজের এক শিক্ষার্থী। তার ভাষ্য, "সবাই যেভাবে রাস্তা পার হয়, আমরাও সেভাবেই পার হই। ডিভাইডার ঠিক থাকলে হয়তো বাধ্য হয়ে নির্দিষ্ট জায়গা ব্যবহার করতে হতো।"
শুধু নিউমার্কেট-আজিমপুর নয়, রাজধানীর আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কেও একই চিত্র দেখা গেছে। রামপুরা, বাড্ডা, নতুন বাজার, কুড়িল বিশ্বরোড, মগবাজার ও তেজগাঁও সাতরাস্তার বিভিন্ন অংশে সড়ক বিভাজকের বড় অংশ এখনো ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে আছে। কোথাও লোহার কাঠামো বাঁকানো, কোথাও পুরো ডিভাইডারই উধাও।
ঠিকানা পরিবহনের চালক শহিদুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, "সড়কের অবস্থা খুবই খারাপ। প্রায় সব এলাকাতেই ডিভাইডার ভাঙা। মাঝখান দিয়ে হঠাৎ মানুষ চলে আসে। আমরা সামনে এগোচ্ছি, হঠাৎই কেউ রাস্তা পার হচ্ছে, তখন জোরে ব্রেক করতে হয়। অনেক সময় পেছনের গাড়িও ধাক্কা খাওয়ার উপক্রম হয়। এরপর আবার দোষ দেওয়া হয় চালকদের।"
রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনের সামনে ফুটওভারব্রিজ থাকা সত্ত্বেও অনেককে ঝুঁকি নিয়ে মূল সড়ক পার হতে দেখা যায়। রামপুরা আবুল হোটেল থেকে কুড়িল বিশ্বরোড পর্যন্ত দীর্ঘ অংশজুড়ে ডিভাইডারের বিভিন্ন অংশ ভাঙা পড়ে রয়েছে। ফলে মানুষ, মোটরসাইকেল, রিকশা ও ভ্যান ইচ্ছেমতো রাস্তা পার হচ্ছে।
মগবাজার ও তেজগাঁও সাতরাস্তা এলাকাতেও একই অবস্থা। সাতরাস্তার মোড়ে ডিভাইডারের কয়েকটি অংশ ভাঙা থাকায় অনেক মোটরসাইকেলকে উল্টো পথে চলাচল করতে দেখা যায়। সুযোগ পেলেই পথচারীরাও সড়কের মাঝখান দিয়ে পার হচ্ছেন। এতে বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় কর্মরত বেসরকারি চাকরিজীবী সোহেল রানা বলেন, "আগে ডিভাইডার থাকায় মানুষ নির্দিষ্ট জায়গা দিয়ে পার হতো। এখন মাঝখান দিয়ে হঠাৎ মানুষ চলে আসে। গাড়িচালকদেরও হঠাৎ ব্রেক করতে হয়। প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।"
ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরাও বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত পারাপারের কারণে যানবাহনের গতি কমে যাচ্ছে। বাড্ডা লিংক রোডে দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক সার্জেন্ট মামুন মিয়া বলেন, "সাধারণ মানুষ যেখানে ইচ্ছা গাড়ি থামিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে। এতে যেমন যানজট বাড়ছে, তেমনি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। ডিভাইডার থাকলে মানুষ বাধ্য হয়ে ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার করত।"
নিউমার্কেট মোড়ে দায়িত্ব পালনরত এক ট্রাফিক সার্জেন্ট বলেন, "মানুষ যখন-তখন রাস্তা পার হচ্ছে। ডিভাইডার না থাকায় মানুষ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।"
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ও নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকার সড়ক ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে ডিভাইডারে শক্ত ব্যারিয়ার স্থাপন এবং ফুটওভারব্রিজ ব্যবহারে পথচারীদের বাধ্য করার ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার কমে আসে।
তিনি আরও বলেন, কংক্রিটের উঁচু দেয়ালের পরিবর্তে ডিভাইডারে পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ ও প্রাকৃতিক সমাধান গ্রহণ করা গেলে পথচারী নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নগরের পরিবেশও উন্নত হবে।
এ ছাড়া সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নাগরিকদের ট্রাফিক আচরণ পরিবর্তনে ব্যাপক সচেতনতা কার্যক্রম চালানোর পরামর্শ দেন তিনি।
সরেজমিনে আরও দেখা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজধানীর যেসব এলাকায় বেশি সংঘর্ষ হয়েছিল, সেসব এলাকার সড়ক বিভাজকের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আন্দোলনের পর অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলেও অনেক স্থানে এখনো সেগুলো মেরামত হয়নি।
বিশেষ করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন রামপুরা, বাড্ডা, নতুন বাজার, কুড়িল বিশ্বরোড, উত্তরা, আব্দুল্লাহপুর, মোহাম্মদপুর ও মিরপুর এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত ডিভাইডারের সংখ্যা বেশি। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব এলাকায় এখনো দৃশ্যমান কোনো সংস্কার উদ্যোগ দেখা যায়নি।
তবে দুই সিটি করপোরেশন বলছে, ধাপে ধাপে ক্ষতিগ্রস্ত ডিভাইডার সংস্কার ও নতুন ফেন্সিং স্থাপনের কাজ চলছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান টিবিএসকে বলেন, "ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের চাহিদা এবং সড়কের গুরুত্ব বিবেচনায় পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সড়কের মিডিয়ান আইল্যান্ডে আরসিসি মিডিয়ান নির্মাণ ও গ্রিল ফেন্সিং স্থাপনের কাজ চলছে।"
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ডিভাইডার মেরামতের কাজ ধাপে ধাপে করা হচ্ছে এবং ব্যস্ত এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, "সড়কের মিডিয়ান আইল্যান্ডে আরসিসি মিডিয়ান ও গ্রিল ফেন্সিং স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। স্থাপিত ফেন্সিং চুরি রোধে লোহার ফেন্সিংয়ের পরিবর্তে আরসিসি মিডিয়ান নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চুরি রোধে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহযোগিতাও চাওয়া হয়েছে।"
