বিশ্ব পরিবার দিবস: ঢাকার পারিবারিক আদালতে ঝুলছে ১২,০০০ মামলা
পারভীন আক্তার (ছদ্মনাম) ও শাকিল খান (ছদ্মনাম) ২৫ বছর আগে ভালোবেসে ঘর বেঁধেছিলেন। শুরুতে পরিবার এই সম্পর্ক মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালেও পরবর্তীতে তারা বিয়েটি মেনে নেয়। বিবাহিত জীবনে এই দম্পতি দুই সন্তানের বাবা-মা হন। তবে দীর্ঘ ২৫ বছরের সেই দাম্পত্য জীবনের সমাপ্তি ঘটেছে তিক্ততায়; এখন একে অপরের বিরুদ্ধে একগুচ্ছ অভিযোগ নিয়ে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন তারা।
মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, ২০০১ সালে ১ লাখ ১ টাকা দেনমোহরে তাদের বিয়ে হয়। দাম্পত্য জীবনের শুরুর কয়েক বছর স্বাভাবিক থাকলেও, অভিযোগ উঠেছে যে পরবর্তীতে শাকিল যৌতুকের জন্য পারভীনকে চাপ দিতে শুরু করেন। নিজের স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করে এবং নগদ অর্থ দিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি পারভীনের, নির্যাতনের মাত্রা দিন দিন বাড়তেই থাকে। শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদের মাধ্যমে দাম্পত্যের ইতি ঘটে এবং বিষয়টি আইনি লড়াইয়ে রূপ নেয়।
শুরুতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে ভরণপোষণ এবং সন্তানদের খরচ চেয়ে পারিবারিক আদালত-৬ এ আরেকটি মামলা করা হয়। ২০২২ সালে দায়ের করা এই মামলাটি বর্তমানে সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। তিন বছর পার হলেও বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি।
ঢাকার পারিবারিক আদালতগুলোতে এমন একই ধরনের বিরোধ নিয়ে আসা হাজারো পরিবারের মধ্যে এই দম্পতি অন্যতম। রাজধানীর ১৪টি পারিবারিক আদালত থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, বর্তমানে ১১ হাজার ৯৩৫টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
ঢাকার পারিবারিক আদালতগুলো এখন এমন হাজার হাজার ফাইলে ঠাসা। গত বছর পর্যন্ত রাজধানীতে মাত্র তিনটি পারিবারিক আদালত ছিল। পারিবারিক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে পরবর্তীতে আদালতের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, বিবাহবিচ্ছেদ, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার, দেনমোহর, ভরণপোষণ, সন্তানদের অভিভাবকত্ব ও হেফাজত এবং মুসলিম পারিবারিক আইনের অধীনে উদ্ভূত অন্যান্য বিরোধ নিষ্পত্তির এখতিয়ার রয়েছে পারিবারিক আদালতের।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে পারিবারিক আদালত-১ এ এক হাজার ২৭টি, আদালত-২ এ এক হাজার ৭৮৩টি, আদালত-৩ এ এক হাজার ১৮টি, আদালত-৪ এ ২৯১টি, আদালত-৫ এ ৫১টি, আদালত-৬ এ ২ হাজার ৮৭০টি, আদালত-৭ এ ৯৯৬টি, আদালত-৮ এ এক হাজার ১০৪টি, আদালত-৯ এ ৩৯২টি, আদালত-১০ এ ৭৬৭টি, আদালত-১১ এ ৬২৯টি, আদালত-১২ এ ১৫২টি, আদালত-১৩ এ এক হাজার ৮৭টি এবং আদালত-১৪ এ ৫৯৮টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এছাড়া পারিবারিক বিষয়াদি নিষ্পত্তির জন্য পাঁচটি আপিল আদালতও রয়েছে।
আদালত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিচারিক কার্যক্রম শুরুর আগে পারিবারিক আদালতের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো পক্ষগুলোর মধ্যে আপস-মীমাংসার চেষ্টা করা। যদি আপস সম্ভব না হয়, তবেই আদালত বিচারিক শুনানির দিকে এগিয়ে যায়।
এই বিচার কার্যক্রম উন্মুক্ত আদালতে বা রুদ্ধদ্বার কক্ষে হতে পারে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের পর আদালত লিখিত রায় ও ডিক্রি প্রদান করেন। কিছু ক্ষেত্রে এই সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে চার থেকে পাঁচ বছর সময় লেগে যায়।
বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের মাশুল দিচ্ছে সন্তানরা
ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা রোজিনা বানু ১৮ বছর আগে পারিবারিকভাবে সেলিম পারভেজের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির আট ও এগারো বছর বয়সী দুটি ছেলে রয়েছে। দাম্পত্য কলহের জেরে তাদের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। তবে সন্তানদের হেফাজত বা কার কাছে থাকবে, তা নিয়ে শুরু হয় আইনি লড়াই। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হলেও এর প্রকৃত শিকার হয়ে পড়ে সন্তানরা।
মামলার নথি থেকে জানা যায়, ২০০৮ সালে তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের কিছুদিন পর রোজিনা জানতে পারেন তার স্বামী মাদকাসক্ত এবং বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িত। এছাড়া যৌতুকের দাবিতে তাকে প্রায়ই মারধর করা হতো বলেও তিনি অভিযোগ করেন। ২০১৮ সালে তার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
অবশেষে ২০২৩ সালে তাদের বিয়ে ভেঙে যায়। আদালতে রোজিনা অভিযোগ করেন, দ্বিতীয় বিয়ের পর যৌতুকের জন্য নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে গিয়েছিল। বিবাহবিচ্ছেদের পর তিনি তার দুই ছেলের হেফাজত চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন, অন্যদিকে বাবাও সন্তানদের নিজের কাছে রাখতে আবেদন করেন।
সন্তানদের একাধিকবার আদালতে হাজির করা হয়। তাদের জবানবন্দি অনুযায়ী, তারা বাবা ও মা—উভয়কেই চায়। মানবাধিকার কর্মীরা মনে করেন, বাবা-মায়ের পক্ষ থেকে শিশুদের প্রতি এমন অবহেলা এক ধরনের অপব্যবহার এবং শিশু অধিকারের লঙ্ঘন।
'আমরাই পারি' পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের নির্বাহী পরিচালক জিনাত আরা হক বলেন, 'পরিবার একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং পরিবার ভেঙে যাওয়ার পরেও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।'
তিনি বলেন, 'রাষ্ট্র পারিবারিক ব্যবস্থাকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দিচ্ছে না এবং দায়িত্ব নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে শিশুরা তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সেই অর্থে বাবা-মা উভয়েই দায়ী।' তিনি আরও যোগ করেন, 'যদি বিচ্ছেদ ঘটতেই হয়, তবে তা একটি সঠিক ব্যবস্থার মাধ্যমে হওয়া উচিত। বাবা-মাকে আগে শিশুদের জন্য একটি সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা ভাবতে হবে।'
নারী অধিকার কর্মী এবং 'নিজেরা করি'-র সমন্বয়ক খুশি কবির বলেন, অনেক পুরুষ দায়িত্ব না নিয়ে একতরফাভাবে স্ত্রী ও সন্তানদের ছেড়ে চলে যান।
তিনি বলেন, 'মতাদর্শগত পার্থক্য, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন প্রায়ই বিয়ে ভেঙে যাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। উন্নত সমাজে দম্পতিদের জন্য কাউন্সেলিং ব্যবস্থা থাকলেও আমাদের এখানে সেই ব্যবস্থার অভাব রয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার দ্বন্দ্বের পরিবেশ শিশুদের জন্য ক্ষতিকর এবং তাদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। অনেকে কেবল সন্তানদের কথা ভেবে কষ্ট সহ্য করে টিকে থাকেন। কিন্তু বিচ্ছেদের আগে উভয় পক্ষেরই বিশেষ করে শিশুদের কথা ভাবা উচিত।'
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ফারহানা জামান বলেন, 'আধুনিক সমাজ দিন দিন ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে।'
তিনি বলেন, 'মানুষ এখন নিজের ইচ্ছাকে অনেক বেশি প্রাধান্য দেয় এবং আপস করার মানসিকতা কমে গেছে। পারিবারিক বন্ধনের গুরুত্বও হ্রাস পাচ্ছে।'
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, নারীদের শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও বিবাহবিচ্ছেদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
তিনি বলেন, 'আগে বিবাহবিচ্ছেদকে সামাজিক কলঙ্ক হিসেবে দেখা হতো, কিন্তু এখন এটিকে আর ততটা নেতিবাচকভাবে দেখা হয় না। তবে পারিবারিক জীবন টিকিয়ে রাখতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমঝোতা অপরিহার্য।' তিনি আরও যোগ করেন, 'একই সাথে, বাবা-মা আলাদা হয়ে গেলে এবং শিশুরা দ্বন্দ্বপূর্ণ পরিবারে বড় হলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিয়ের আগে মানুষের সঠিক বোঝাপড়া এবং মানসিক সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন।'
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির (বিএনডব্লিউএলএ) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বর্তমান উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, 'বর্তমানে মানুষ একে অপরকে সম্মান করতে চাইছে না।' তিনি আরও বলেন, 'পরিবার ও আত্মীয়স্বজন সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে সময় কাটানো প্রয়োজন।'
হিউম্যান রাইটস মনিটরিং অর্গানাইজেশনের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মাহমুদা আক্তার বলেন, 'আধুনিক জীবনযাপন পরিবারের ভেতরে মানসিক দূরত্ব তৈরি করছে।'
তিনি আরও বলেন, 'স্বামী বা স্ত্রী কেউই একে অপরকে যথেষ্ট সময় দিচ্ছেন না কারণ সবাই টাকার পেছনে ছুটছেন, যা ৩০ বা ৪০ বছর আগেও এমন ছিল না।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'এই সমস্যাগুলোর কারণে শিশুরা বঞ্চিত হচ্ছে। পারিবারিক মূল্যবোধ.এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা কমেছে, অন্যদিকে বস্তুগত চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।'
তিনি স্কুল-কলেজে নৈতিক শিক্ষা দেওয়া এবং ধর্মীয় শৃঙ্খলা জোরদার করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন বলেন, 'পারিবারিক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আদালতের সংখ্যা বাড়ানো এবং ই-ফ্যামিলি কোর্ট চালুসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান যে, বর্তমান সরকার মামলার জট কমাতে আন্তরিক।
তিনি বলেন, 'বিচারকগণ ছুটিতে থাকা বা পদ শূন্য থাকার কারণে প্রায়ই মামলা বিলম্বিত হয়। অন্যদিকে বিবাদীরা বিচারিক কার্যক্রম দীর্ঘায়িত করতে বারবার সময়ের আবেদন করেন, যা বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তির কারণ হয়।'
তিনি আরও বলেন, আইনজীবীদেরও সদিচ্ছা প্রয়োজন এবং তিনি আশা প্রকাশ করেন যে আগামী দিনগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা কমে আসবে।
