জুলাই সনদকে বিএনপি প্রতারণার দলিলে পরিণত করেছে: নাহিদ ইসলাম
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদকে অন্তহীন প্রতারণার দলিলে পরিণত করেছে বিএনপি। একইসাথে এই সনদকে দলীয় ইশতেহারে পরিণত করে এর মহত্ত্ব কলুষিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আজ বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ অভিযোগ করেন৷
নাহিদ ইসলাম বলেন, 'জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফসলকে একটা নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে কলুষিত করা হয়েছে। সনদে লেখা হয়েছে—কোনো দল নির্বাচনে জিতলে তাদের ইশতেহার অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে। তাহলে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন কী? বিএনপি জুলাই সনদকে প্রতারণার দলিলে পরিণত করেছে।'
নাহিদ ইসলাম বলেন, '৭২-এর সংবিধানকে আওয়ামী লীগ দলীয় ইশতেহারে পরিণত করেছিল, কলুষিত করেছিল এবং জুলাই জাতীয় সনদকে বিএনপি কলুষিত করেছে, দলীয় ইশতেহারে পরিণত করেছে। আপনি বলছেন জুলাই জাতীয় সনদ, তারপরে আপনি দেখাচ্ছেন দলীয় ইশতেহার; তাহলে এখানে তো কোনো ঐকমত্যের সুযোগ নাই।'
গণভোট ও বিএনপির অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'গণভোটের আদেশ নিয়ে সমালোচনা আছে এবং এই সমালোচনা আমরাও করেছি যে রাষ্ট্রপতি এই ধরনের অর্ডার দিতে পারে কি না। কিন্তু গণভোটটাকে সবাই মেনে একটা কনসেনসাসের ভিত্তিতেই তো আমরা এই গণভোটে অংশগ্রহণ করলাম। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তিনি নিজেও গণভোটে 'হ্যাঁ'-এর পক্ষে প্রচারণা করেছেন। নির্বাচনের আগে বিএনপির পরিষ্কার করা প্রয়োজন ছিল যে এই গণভোট তারা মানে না। কিন্তু বিএনপি সেটা করেনি।'
জুলাই অভ্যুত্থানের রায়কে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, 'জুলাই গণভোট এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং গণরায়। মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তিনি নিজেই সেই সময় বলেছেন যে গণরায় হচ্ছে সার্বভৌম ক্ষমতা। জনগণের রায় আসলে সেটা সকলেই মেনে নিতে বাধ্য হবে। এমনকি যদি সেটার বিরুদ্ধেও কেউ বিজয়ী হয় তারাও সেটা মেনে নিতে বাধ্য হবে। ফলে আমরা মনে করি যে গণভোট অনুসারে সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদ অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে গঠন করা উচিত। এর সুরাহা করা উচিত।'
দেশের রাজনীতিতে বিদ্যমান মেরুকরণ নিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, 'দেশের রাজনীতিতে 'সাথে থাকলে সঙ্গী, না থাকলে জঙ্গি'—এই সংস্কৃতি চলছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও সংসদে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে বিভাজন থাকা কাম্য নয়।'
তিনি আরও বলেন, 'মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের রাজনীতি বিগত ৫০ বছর ধরে চলছে। কিন্তু এর সমাধান কেন হলো না? বিএনপি ২৯ বছর জামায়াতের সাথে রাজনীতি করেছে। এখন সবাই বলে— সাথে থাকলে সঙ্গী, না থাকলে জঙ্গি। এর মীমাংসা করার দায়িত্ব ছিল বড় দলগুলোর।'
মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্যকার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, 'মুক্তিযুদ্ধকে আমরা শ্রদ্ধা করি। আমরা মনে করি এই প্রজন্ম যারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করেছি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের নতুন রূপ তৈরি হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের নবায়ন হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সাথে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থান নেই। আমরা বারবার বলেছি মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি ধারাবাহিকতা। মুক্তিযুদ্ধে আমরা সাম্য ও মানবিক মর্যাদার কথা বলেছি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আমরা বৈষম্যবিরোধী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের কথা বলেছি। কোথায় পার্থক্য? কোথায় আলাদা?'
তিনি আরও যোগ করেন, 'কোন ঘটনা বড় কোন ঘটনা ছোট—এটা অহৈতুকি তর্ক। আমরা কেউ বলি নাই যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান মুক্তিযুদ্ধের থেকে বড় বা জুলাই গণঅভ্যুত্থান ৯০-এর থেকে বড় বা ৯০-এর থেকে ছোট। জুলাই গণঅভ্যুত্থান এক বিশেষ ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে, মুক্তিযুদ্ধ এক বিশেষ ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ফাউন্ডেশন। এটার ব্যাপারে আমরা আনকমপ্রমাইজেবল, এটা নিয়ে কোনো বিতর্কের কোনো সুযোগ নাই। তবে এই কথাটা উনারাই বারবার বলে মুক্তিযুদ্ধকেও ছোট করছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকেও ছোট করছেন।'
মুজিব বাহিনীর ভূমিকা এবং জামুকা আইন সংশোধন নিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, 'আমরা সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) আইন সংশোধন করলাম, অধ্যাদেশ পাস করা হলো, সেখানে কিন্তু একটা গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী এসেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞা থেকে মুজিব বাহিনীকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এবং আপনারা জানেন যে এই মুজিব বাহিনীকে সংযুক্তির মাধ্যমে হাজার হাজার ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীকে মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছিল। মুজিব বাহিনীর ভূমিকা কী ছিল এটা আপনারা এখানে যারা অভিজ্ঞ ও মুক্তিযোদ্ধা আছেন তারা ভালো করেই জানেন। মুজিব বাহিনী তৈরি হয়েছিল অন্তর্ঘাত তৈরি করার জন্য। তারা অস্ত্র হাতে দেশের পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে নাই। তারা দেশে ঢুকে মুক্তিযুদ্ধের আওয়ামী লীগ বাদে অন্য যে পক্ষগুলো রয়েছে তাদেরকে হত্যা করেছিল। ফলে মুজিব বাহিনী কিন্তু কোনো মুক্তিযোদ্ধা না। বর্তমানে আইন অনুসারে কিন্তু এখানে অনেক মুজিব বাহিনীর লোক আছেন, তারা নিজেদেরকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বারবার জাহির করছেন। আমাদেরকে এই ফারাকটাও করতে হবে।'
জুলাই আন্দোলনে বিএনপির অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'মাননীয় স্পিকার, জুলাই গণঅভ্যুত্থান সকলের অংশগ্রহণে হয়েছিল। এটা আমরা বারবার বলেছি। তবে বিএনপির বিভিন্ন সদস্য তারা তাদের আলোচনায় বারবার বলার চেষ্টা করেন যে আমরা ছিলাম না, আমরা এভাবে ছিলাম ওভাবে ছিলাম। এটা তো প্রমাণ করার প্রয়োজন নাই। বিএনপি তো অবশ্যই জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছিল, আমাদের সাথেই ছিল এবং সেই সময়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন যে 'এই আন্দোলনের সাথে আমাদের সম্পর্ক নাই, এটা ছাত্রদের আন্দোলন'। তার ওই বক্তব্য সঠিক ছিল। উনার ওই সময়ে কৌশলগত অবস্থান এটাই সঠিক ছিল। উনার ওই সময়ে এই বক্তব্যই প্রয়োজন ছিল, এটাতে তো আমাদের কোনো দ্বিমত নাই।'
আন্দোলন চলাকালীন গোয়েন্দা সংস্থার নির্যাতন ও চাপের মুখেও সত্যের অপলাপ না করার কথা জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, 'আমাকে ডিজিএফআই, ডিবি, এসবি—বাংলাদেশের হেন কোনো গোয়েন্দা সংস্থা নাই যারা আমাকে ইন্টারগেশন করেনি, টর্চার করেনি। এবং একটা কথা বারবার বলানোর চেষ্টা করেছিল যে—এ আন্দোলন বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলন, যারা আগুন লাগিয়েছে তারা বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসী। এটা একবার তোমরা শুধু বলো। ডিবি অফিসে শেষ পর্যন্ত আমরা বাধ্য হয়েছি আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দিতে, কিন্তু কখনো এই কথাটা আমরা বলিনি। ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের আমরা আন্দোলনের সময় থেকে এখন পর্যন্ত কখনো অস্বীকার করি নাই।'
