বারবার উচ্ছেদেও কেন দখলমুক্ত হচ্ছে না ফুটপাত?
রাজধানীর ফুটপাত দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান নতুন কিছু নয়। সম্প্রতি ঢাক-ঢোল পিটিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) আট বিভাগে একযোগে উচ্ছেদ অভিযান চালায় ট্রাফিক পুলিশ।
বিশেষ অভিযানে হকার উচ্ছেদের পাশাপাশি জরিমানা ও কারাদণ্ডের মাধ্যমে কঠোর বার্তা দেওয়া হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অভিযান শেষ হলেই আবার ফুটপাত দখল করে বসছেন হকাররা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—বারবার উচ্ছেদেও কেন ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা যাচ্ছে না?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাবই এর মূল কারণ। এছাড়া বিকল্প ব্যবস্থা না থাকা, প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা, লোক দেখানো অভিযান, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘাটতি এবং স্বার্থন্বেষী মহলের প্রভাবে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
গত ১ থেকে ৫ এপ্রিল পূর্ব ঘোষণা দিয়ে ডিএমপির আটটি বিভাগে সমন্বিত উচ্ছেদ অভিযান চালায় ট্রাফিক পুলিশ।
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফা আখতার প্রীতি জানান, এ অভিযানে ফুটপাত দখলকারীদের কাছ থেকে ১১ লাখ ৩১ হাজার ৪৫০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এছাড়া, ৪৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অবৈধ পার্কিংয়ের অভিযোগে ১৭০টি ভিডিও মামলা দেওয়া হয় এবং অবৈধভাবে স্থাপিত দোকান ও যানবাহনসহ বিভিন্ন মালামাল জব্দ করা হয়।
তবে অভিযানের পরও ফুটপাত দখলমুক্ত হয়নি। নিউমার্কেট, নীলক্ষেত, গুলিস্তান, সায়েন্সল্যাব, শাহবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, আগের মতোই ফুটপাত দখল করে জামা-কাপড়, বই, জুতা, ফলসহ নানা পণ্য বিক্রি করছেন হকাররা। ট্রাফিক ও থানা পুলিশের সামনেই চলছে এসব কার্যক্রম।
বিক্রেতারা বলছেন, এ ধরনের অভিযান তাদের জন্য নতুন নয়। বারবার উচ্ছেদে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও জীবিকার তাগিদে তারা আবার বসছেন। অনেক সময় পুলিশ-প্রশাসনের সঙ্গে দেন-দরবার করতে হয় এবং চাঁদার পরিমাণও বাড়ে। পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদে স্থায়ী সমাধান হবে না।
নীলক্ষেতে ফুটপাতে লেখার প্যাড, খাতা ও কলম বিক্রি করেন মো. আসিফ। তিনি বলেন, "অভিযান শুরু হলেই সব সরিয়ে ফেলি। আবার অভিযান শেষে এসে বসি। এটা নতুন কিছু নয়, আমরা এতে অভ্যস্ত।"
গুলিস্তানের গোলাপশাহ মাজার এলাকায় শিশুদের পোশাক বিক্রি করেন নিজাম উদ্দিন। তিনি বলেন, "অভিযানের সময় পুলিশ জিনিসপত্র নিয়ে গেছে। পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে ছাড়া পেয়েছি। কিন্তু সংসার চালাতে হবে, তাই আবার বসেছি। পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ করলে আমরা খাবো কী?"
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রাম ও ছোট শহরে কর্মসংস্থান না থাকায় মানুষ শহরে আসছে। শহরেও পর্যাপ্ত চাকরি না থাকায় নিম্ন আয়ের মানুষ ফুটপাতে ব্যবসা করছেন। দোকান ভাড়া ও কর্মচারীর খরচ বেশি হওয়ায় তারা ফুটপাতকেই বেছে নিচ্ছেন।
তারা আরও বলেন, ফুটপাত থেকে বড় অঙ্কের চাঁদা ওঠায় প্রভাবশালী মহল এটি টিকিয়ে রেখেছে। অনেক সময় উচ্ছেদ অভিযানও নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়। পরে মাসোহারা ঠিক হলে আবারও বসার সুযোগ দেওয়া হয় হকারদের।
অন্যদিকে, মাঝে মাঝে উচ্ছেদ অভিযান চালালেও জনবল সংকটে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি নাইট মার্কেট বা হলিডে মার্কেটের মতো বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় শ্রমজীবী মানুষদের বিষয়টি বিবেচনায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে শুধু উচ্ছেদ নয়, সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। হকারদের পুনর্বাসন, নির্দিষ্ট স্থানে ব্যবসার সুযোগ, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং নিয়মিত ও স্বচ্ছ আইন প্রয়োগ—এসব একসঙ্গে বাস্তবায়ন না হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান কঠিন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, "যতদিন গ্রাম ও শহরের মধ্যে অর্থনৈতিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য থাকবে, ততদিন এই সমস্যা থাকবে।"
তিনি বলেন, "আমাদের দেশে কর্মসংস্থান শহরকেন্দ্রিক। নিম্ন আয়ের মানুষ কাজের খোঁজে শহরে আসে। তাই গ্রাম ও ছোট শহরগুলোতে কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে এবং বৈষম্য কমাতে হবে। তা না হলে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে স্থায়ী সুফল পাওয়া যাবে না। কিছুদিন ফুটপাত ফাঁকা থাকলেও পরে আবার দখল হয়ে যাবে।"
তিনি আরও বলেন, নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেও অনেক সময় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। "নতুন প্রশাসক বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব এলে এমন অভিযান দেখা যায়। পরে সমঝোতা হলে তারাই আবার ফুটপাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হকার বসার সুযোগ দেয়। এ ক্ষেত্রে পুনর্বাসন করা গেলে ইতিবাচক ফল আসতে পারে।"
হকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হযরত আলী বলেন, "উচ্ছেদ অভিযান অনেক সময় রাজনৈতিক প্রদর্শনীতে পরিণত হয়। অতীতেও এমন অভিযান হয়েছে, এখনও হচ্ছে। পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ কোনো সমাধান নয়।"
তিনি বলেন, "আমরা মনে করি, অন্যান্য দেশের মতো হকারদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখে নির্দিষ্ট জায়গায় বসার সুযোগ দেওয়া উচিত। ফুটপাতের একটি অংশ নির্ধারণ করে দিলে পথচারীরা চলতে পারবে, আবার নিম্ন আয়ের মানুষও সাশ্রয়ী দামে পণ্য কিনতে পারবে। কিন্তু আমাদের কথা শোনা হয় না।"
তিনি আরও বলেন, "কিছুদিন উচ্ছেদ করা হয়, পরে আবার নতুন করে হকার বসানো হয়। এতে বিভিন্ন স্তরের লোক জড়িত থাকে। তাই শুধু উচ্ছেদ করে সমস্যার সমাধান হবে না।"
এ বিষয়ে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মো. আনিছুর রহমান বলেন, "এবারের অভিযানে আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল স্থায়ী দোকানের বাড়তি অংশ অপসারণ করা। অভিযানের সময় হকাররাও সরে যায়। আমাদের মূল উদ্দেশ্য অর্জিত হয়েছে।"
তিনি বলেন, "হকারদের বিষয়ে সরকার চিন্তা করছে। ডিএমপির আট বিভাগে আটটি নাইট মার্কেট ও হলিডে মার্কেট গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে হকারদের জন্য স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব হবে।"
তিনি আরও বলেন, "হকাররা পরিশ্রমী মানুষ। আমরা তাদের বিরুদ্ধে নই। এটি একটি বড় সমস্যা, যার সমাধান ধাপে ধাপে করতে হবে। সরকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং ট্রাফিক বিভাগও এ বিষয়ে কাজ করছে।"
