ঋণখেলাপিরা এখন রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ, সংস্কারে বাধা সৃষ্টি করছে: রেহমান সোবহান
অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান বলেছেন, বাংলাদেশের ঋণখেলাপিরা এখন রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে ঢুকে পড়েছে। তারা আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পথে বাধা সৃষ্টি করছে।
গতকাল (১৯ এপ্রিল) ঢাকায় আয়োজিত সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) তিন দিনব্যাপী নবম বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনের সমাপনী দিনে তিনি এ কথা বলেন।
রেহমান সোবহান বলেন, 'ঋণখেলাপিরা এখন রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ হয়ে উঠেছে। তারাই সংস্কারের কাজে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে এই সমস্যাটি এখন আর ব্যক্তিবিশেষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে।'
'রোমান্সিং দ্য রিফর্ম: দ্য বাংলাদেশ স্টোরি' ওই শীর্ষক অধিবেশনে তিনি আরও বলেন, 'সংস্কার মানে কেবল আইন পাশ করা নয়। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যার জন্য সঠিক বাস্তবায়ন, প্রয়োগ ও দৃশ্যমান ফলাফল প্রয়োজন।'
রেহমান সোবহান বলেন, আইন প্রণয়নের পর সরকার সেগুলো সঠিকভাবে মেনে চলে বলে অনেক সংস্কার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। 'সংস্কারের প্রথম ধাপ হলো আইন প্রণয়ন, এরপর প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি হবে, আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে এবং সবশেষে ফলাফল মূল্যায়ন করা হবে।'
অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এছাড়া সাবেক অর্থ সচিব এবং সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী নির্ধারিত আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রয়োজন
রেহমান সোবহান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের সময় বড় বড় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়নের মতো নেতৃত্ব বা অঙ্গীকার তাদের আছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
তিনি বলেন, অতীতে সংস্কার কর্মসূচি তখনই সফল হয়েছে যখন সেগুলোর পেছনে জনগণের জোরালো সমর্থন ছিল। উদাহরণ হিসেবে তিনি ব্যাপক জনসমর্থনপুষ্ট সংস্কার কর্মসূচি ছয় দফা আন্দোলনের কথা উল্লেখ করেন।
বর্তমানে এ ধরনের গণভিত্তিক প্রচার দুর্বল হয়ে পড়েছে মন্তব্য করে এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহার ভোটারদের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছাতে পারছে না। 'এমনকি দলের অনেক সদস্যই নিজেদের ইশতেহারের বিষয়বস্তু সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন না।'
নীতি আলোচনার সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে রেহমান সোবহান বলেন, কতজন আলোচকের সরাসরি সরকারে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে? তিনি বলেন, প্রশাসনের ভেতরে কাজ করার অভিজ্ঞতা না থাকলে সংস্কারের বিষয়টি পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। 'কে সংস্কার চান, কে এর বিরোধিতা করেন এবং কেন অনেক সময় সংস্কার সফলভাবে বাস্তবায়িত হয় না—সরকারে কাজ না করলে তা অনেক সময় বোঝা যায় না।'
পরিকল্পনা কমিশনে কাজ করার সময়কার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংস্কারের আইন পাশ করা মূল চ্যালেঞ্জ ছিল না।
পুলিশ সংস্কারের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, এর সাফল্য পরিমাপ করা উচিত বাস্তবে তার ফলাফল দিয়ে। যদি জবাবদিহিতার ব্যবস্থা চালু করা হয়, তবে তা সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিকরা সময়ের ব্যবধানে পরীক্ষা করে দেখবেন। 'এটাই হবে সংস্কারের প্রকৃত পরীক্ষা,' বলেন তিনি।
রেহমান সোবহান বলেন, বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) যেসব সংস্কার প্রস্তাব দেয়, সেসবের অনেকগুলোই নতুন নয়। বরং কয়েক দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সরকারের আমলে এগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তার মতে, অনেক সময় ঋণের অর্থ ছাড়ের জন্য সরকার সংস্কারের ক্ষেত্রে সামান্য কিছু অগ্রগতি দেখায়, আবার উন্নয়ন সহযোগীদেরও দেখানোর তাগিদ থাকে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে।
'দীর্ঘমেয়াদে আসলে কী ঘটছে, তা খুব কমই খতিয়ে দেখা হয়,' বলেন তিনি।
পারফরম্যান্সভিত্তিক বাজেট ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা
রেহমান সোবহান বলেন, সরকারি ব্যয়ের মাধ্যমে কী ফলাফল অর্জিত হচ্ছে, তা জনগণকে দেখানোর জন্য তিনি বারবার পারফরম্যান্সভিত্তিক বাজেট ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছেন। 'বর্তমানে শুধু ব্যয়ের হিসাব দেওয়া হচ্ছে, যাতে ফলাফলের কোনো বিশ্লেষণ থাকছে না,' বলেন তিনি।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এই খাতগুলোতে বরাদ্দ কম থাকে বলে অভিযোগ থাকলেও প্রায়ই দেখা যায় বরাদ্দকৃত অর্থ পুরোপুরি ব্যবহৃত হচ্ছে না। তার প্রশ্ন, বরাদ্দের অর্থ ঠিকভাবে ব্যবহার না হলে সমস্যাটা তাহলে কোথায়?
ভারতের উদাহরণ দিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, দেশটিতে খাদ্য, শিক্ষা ও কাজের অধিকারের মতো বড় বড় সংস্কারগুলো শক্তিশালী নাগরিক আন্দোলনের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে নাগরিক সমাজ বিচ্ছিন্ন এবং তারা বড় ধরনের সংস্কারের জন্য সম্মিলিত চাপ তৈরি করতে পারছে না।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকেই সংস্কারের চূড়ান্ত পরীক্ষা হিসেবে অভিহিত করে তিনি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আহ্বান জানান। 'একটি সরকার তখনই প্রকৃত অর্থে জবাবদিহিমূলক হয়, যখন তারা জনগণের রায় গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকে।'
