বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে ঝুঁকির মুখে দেশের টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক
দেশে চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে মোবাইল টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছে মোবাইল অপারেটরগুলো। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সারা দেশে নেটওয়ার্ক সচল রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন 'অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অফ বাংলাদেশ' (এমটব) ইতোমধ্যে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) এ বিষয়ে সতর্ক করেছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং জ্বালানি ঘাটতি টেলিকম অবকাঠামোর ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে।
অপারেটরদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশের অনেক এলাকায় বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্ন ঘটায় তারা নেটওয়ার্ক সচল রাখতে জেনারেটরের ওপর ধীরে ধীরে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।
এমটব-এর তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে বিটিএস (বেস ট্রান্সিভার স্টেশন) বা মোবাইল টাওয়ারগুলো সচল রাখতে অপারেটররা প্রতিদিন প্রায় ৫২ হাজার ৪২৫ লিটার ডিজেল এবং ১৯ হাজার ৮৫৯ লিটার অকটেন ব্যবহার করছে।
এ ছাড়া গ্রামীণফোন, রবি এবং বাংলালিংকের মতো বড় অপারেটরদের ডেটা সেন্টার এবং সুইচিং হাবগুলো পরিচালনার জন্য প্রতিদিন প্রায় ২৭ হাজার ১৯৬ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। কোনো কোনো স্থাপনায় ঘণ্টায় ৫০০ থেকে ৬০০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল খরচ হচ্ছে।
এমটব সভাপতি জানান, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ সেবা নিশ্চিত করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি উল্লেখ করেন, মোবাইল সংযোগ এখন কেবল কথা বলার মাধ্যম নয়, বরং ব্যাংকিং লেনদেন, জরুরি সেবা এবং ডিজিটাল পরিষেবার জন্য অপরিহার্য। ফলে দীর্ঘস্থায়ী নেটওয়ার্ক বিভ্রাট জনজীবনে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে।
এমটব-এর মহাসচিব লে. কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার বলেন, বিদ্যুৎ বা জ্বালানি সংকটের কারণে যদি অপারেটরদের ডেটা সেন্টারগুলো বন্ধ হয়ে যায়, তবে এর প্রভাব দ্রুত পুরো নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়বে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ডেটা সেন্টার হলো অপারেটরের মস্তিষ্ক। যদি এটি অচল হয়ে যায়, তবে পুরো নেটওয়ার্কই অচল হয়ে পড়বে।
এমটব জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের অনেক এলাকায় দৈনিক ৫ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বিধিনিষেধ ও লজিস্টিক সীমাবদ্ধতার কারণে আন্তঃজেলা জ্বালানি পরিবহনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
দেশজুড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া রোধ করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছে এমটব। তাদের মূল দাবির মধ্যে রয়েছে—টেলিকম ডেটা সেন্টারগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, মোবাইল টাওয়ারগুলোকে বিদ্যুতের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া, ডিপো থেকে সরাসরি জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা এবং জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি পরিবহনের সুবিধা প্রদান।
বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী বলেন, টেলিযোগাযোগ একটি অতি জরুরি সেবা এবং সেবাটি সচল রাখতে কমিশন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে কাজ করছে।
গ্রামীণফোনের চিফ কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটররা (এমএনও) বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সহজলভ্যতা নিয়ে নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। প্রতিকূল এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের ধারাবাহিক সহযোগিতার আমরা প্রশংসা করি। তবে পরিস্থিতির ক্রমাগত পরিবর্তন হওয়ায় দেশজুড়ে নিরবচ্ছিন্ন টেলিকম সেবা বজায় রাখতে এখন সময়োপযোগী ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। এই প্রেক্ষাপটে, আমরা সরকারের কাছে আরও সহযোগিতা কামনা করছি—বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ টেলিকম অবকাঠামোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা; ডেটা সেন্টার, সুইচিং সুবিধা এবং বেস স্টেশনগুলোর জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহে অগ্রাধিকার প্রদান; জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সহজতর করা এবং জরুরি প্রয়োজনে জ্বালানি পরিবহন ত্বরান্বিত করা। লক্ষ্য হচ্ছে, কোটি কোটি গ্রাহকের অপরিহার্য সেবাগুলোতে যেন কোনো বিঘ্ন না ঘটে তা নিশ্চিত করা।
