ধীরে ধীরে জৌলুস হারাচ্ছে হালখাতার উৎসব
বর্তমানে ডিজিটালের ছোঁয়ায় পহেলা বৈশাখের সেই হালখাতার উৎসব ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার পথে। এখন হালখাতা উৎসব যেন পরিণত হয়েছে নিয়ম রক্ষার উৎসবে। দোকানগুলোতে আর নেই সেই আলোকসজ্জা। হালখাতার কার্ড ছাপানোয় নেই সেই তড়িঘড়ি। এছাড়া দাওয়াত দিয়েও ক্রেতাদের হালখাতার দিন পাওয়া যায় না বলেও অভিযোগ রয়েছে ব্যবসায়ীদের।
গত ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে রাজধানীর পুরান ঢাকার তাতি বাজারের ঋক্তিকা জুয়েলার্স নামে এক স্বর্ণের দোকান পরিচালনা করে আসছেন রবি ঘোষ।তিনি বলছিলেন, একসময় হালখাতার দিনে দম ফেলার ফুরসত মিলতো না। কত শত মিষ্টি, আর উপহারে ঢাসা থাকত দোকানে। এসব এখন কেবলই স্মৃতি। যদিও নিয়ম রক্ষা করতে সীমিত পরিসরে হালখাতার আয়োজন করে আসছি।
তিনি আরও বলেন, স্বর্ণের ভরি যখন ১০০ টাকা ছিল, তখন থেকে আমি এই ব্যবসায় জড়িত। এখন আর আগের মতো জমজমাট হয় না। আর আমরাও কাস্টমারদের বলি না। বললেও কেউ আসে না। শুধু নিয়মটাই মানা হচ্ছে, আর কিছু না। আগের মতো আর আনন্দ নেই। আগে আমরা দোকান সাজসজ্জা করেনি।
একই গলির তাইবা ইসলাম জুয়েলার্স দোকানের মালিক মো. রবিউল ইসলাম বলেন, এক সময়ের জাকজমকপূর্ণ হালখাতার উৎসব গত এক দশকে ধারাবাহিকভাবে জৌলুস হারিয়েছে। বছরের প্রথম দিন হিসেবে আগে যে রকম আনন্দ হতো, তা এখন আর হয় না। এখন বাপ-দাদার নিয়ম মেনে আসছি। কিছু কাস্টমার আছেন, পহেলা বৈশাখের দিনে দাওয়াত দিলে আসেন। তাদের জন্য মিষ্টি, বিভিন্ন গিফটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে আগের মতো আনন্দ আর নেই।
গত ১০ বছর ধরে তাতি বাজারে নতুন হিসাবের খাতা বিক্রয় করেন আসছেন মো. রবিউল ইসলাম। তিনি জানান, পহেলা বৈশাখে হালখাতার উৎসবের দিনে নতুন খাতা প্রচুর বিক্রি হতো। বেচা-কেনার জন্য দম ফেলানোর সময় পাওয়া যেত না।
তিনি বলেন, গত চার-পাঁচ বছর ধরে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে নতুন হিসাবের খাতা বিক্রয় কমেছে। ডিজিটালের ছোঁয়ায় দিনে দিনে কাগজের খাতা কেনার আগ্রহ হারাচ্ছে মানুষ। দিনে দিনে আমাদের ব্যবসাও হারানোর পথে। এখন নাম মাত্র বিক্রয় হয় এসব খাতা।
একই এলাকার হিটলার চন্দ্র ঘোষাল নামে আরেক ব্যবসায়ী বলেন, 'এখন আর আগের মতো হালখাতার গুরুত্ব নেই। আর কেউ আসেও না। যারাও আসে তারাও অতি প্রয়োজনে আসেন। একটা সময় হালখাতার দিন এসব দোকানগুলো মুখর থাকত ক্রেতাদের পদচারণায়। বাহারি সাজে সাজতো দোকান, মিষ্টি ভর্তি হাড়ি থাকতো দোকানের কোনায়, আর লাল খাতায় চলতো নতুন বছরের দেনা-পাওনার হিসাব। তবে আজকাল এসব দৃশ্য হারিয়েছে। উৎসবহীন দোকানে হালখাতা এখন কেবলই নিয়ম রক্ষার উৎসব।'
অন্যদিকে, হালখাতার সাথে আকর্ষণ হারিয়েছে উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ লালসালু (লাল রঙের সুতি কাপড়বিশেষ) মোড়ানো ঐতিহ্যবাহী খাতাও। এক সময়ে ব্যাপক চাহিদা থাকলেও সময়ের পরিক্রমায় অনেকেই ব্যবসার হিসাব রাখতে বেছে নিয়েছেন ডিজিটাল মাধ্যম। শহর থেকে গ্রাম সবখানেই লাল মলাটের সেই প্রাচীন আভিজাত্য এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে শামিল।
মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে বাংলা সাল প্রবর্তনের পর থেকে বৈশাখ মাসের প্রথম দিন বাংলার ব্যবসায়ীরা নতুন খাতা বা হালখাতা খোলার প্রথা চালু করেন। যা ৪০০ বছরের বেশি সময় ধরে প্রচলিত আছে।
বছরের প্রথম দিনে ব্যবসায়ীরা খদ্দেরদের সঙ্গে বিগত বছরের খাতায় তাদের দেনা-পাওনার হিসাব চুকিয়ে এ দিন হিসাবের নতুন খাতা খোলেন। এ উপলক্ষে ব্যবসায়ীরা তাদের খদ্দেরদের মিষ্টিমুখ করান। খদ্দেররাও তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী পুরোনো দেনা শোধ করেন।
