মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ঝুঁকি: অর্থমন্ত্রী
জ্বালানির ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সরবরাহের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
সোমবার (৬ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের বাজেট বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপনের সময় তিনি এ কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, 'সাম্প্রতিক বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তাসহ অত্যাবশ্যকীয় পণ্য সরবরাহ চেইনে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা এই প্রবৃদ্ধি অর্জনের পূর্বাভাসকে চ্যালেঞ্জিং করে তুলতে পারে। জ্বালানির বৈদেশিক উৎস, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সরবরাহের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।'
দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে আমীর খসরু বলেন, 'বিগত ১৮ বছরের আর্থিক খাতের সীমাহীন লুটপাট ও দুঃশাসন আমাদের জন্য যে কঠিন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রেখে গেছে তা মোকাবিলা করে দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধিই এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য।'
তিনি বলেন, 'গত পাঁচ বছর ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বিরাজমান অস্থিতিশীল অবস্থার কারণে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল সকল দেশের নিম্ন প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধিসহ অন্যান্য প্রতিকূলতা কাটিয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধসহ বৈশ্বিক অস্থির পরিস্থিতি আমাদের অর্থনীতির জন্য সামনের দিনগুলোকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।'
বৈশ্বিক অর্থনীতির পূর্বাভাস সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী জানান, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, উন্নত অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালে সামান্য হ্রাস পেয়ে ১.৭ শতাংশে স্থিতিশীল থাকতে পারে। তবে ২০২৫ সালে উদীয়মান ও উন্নয়নশীল এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের কাছাকাছি অর্জিত হতে পারে।
মূল্যস্ফীতির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০২২ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৭ শতাংশ। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ৪.২ শতাংশ এবং ২০২৬ সালে ৩.৮ শতাংশে নেমে আসতে পারে। উন্নত অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি মধ্যমেয়াদে ২ শতাংশের কাছাকাছি এবং উদীয়মান উন্নয়নশীল এশিয়ার দেশগুলোতে মধ্যমেয়াদে ৩ শতাংশের নিচে থাকতে পারে। বাংলাদেশের আমদানি পণ্যের প্রধান উৎস চীন ও ভারতে মধ্যমেয়াদে মূল্যস্ফীতি যথাক্রমে ২ ও ৪ শতাংশের কাছাকাছি থাকার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
অর্থমন্ত্রী জানান, কোভিড-১৯ উত্তর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ২০২২-২৩ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে গৃহীত সংকোচনমূলক নীতির ফলে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়েছে। তবে বর্তমান সরকারের বিনিয়োগবান্ধব উদ্যোগ ও কর্মসৃজনসহ অন্যান্য কার্যক্রম অর্থনীতিকে পুনরায় গতিশীল করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
খাদ্য মজুত ও উৎপাদন বিষয়ে তিনি বলেন, 'খাদ্যশস্য মজুদের পরিমাণ সন্তোষজনক পর্যায়ে রাখা, খাদ্যশস্য আমদানিতে শুল্কছাড় ইত্যাদি কার্যক্রম মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে। সর্বশেষ প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালের শিল্প উৎপাদন সূচক পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বৃহৎ, মাঝারি এবং ক্ষুদ্র শিল্পের উৎপাদন বেড়েছে।'
তিনি আরও জানান, চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবাস আয় এবং রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। এ সময়ে প্রবাস আয় এবং রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ১৫.৯৪ এবং ৫.২৬ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যমাত্রা সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেন, 'সেপ্টেম্বর ২০২৫ শেষে সাধারণ মূল্যস্ফীতি (বারো মাসের গড় ভিত্তিতে) দাঁড়িয়েছে ৯.৪৫ শতাংশে। এ সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৫৮ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৩৩ শতাংশ।'
তিনি জানান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাতিল এবং সহায়ক রাজস্বনীতিসহ নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর ফলে চলমান অর্থবছরের শেষ নাগাদ মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। সার্বিক বিবেচনায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের গড় মূল্যস্ফীতি ৭.০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, মূল্যস্ফীতির চাপ আগামীতে আরও কমে ২০২৬-২৭, ২০২৭-২৮ এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে যথাক্রমে ৬.০, ৫.৫ ও ৫.০ শতাংশে নেমে আসবে এবং একই সাথে জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতি বৃদ্ধি পাবে।
