কুমিল্লায় ট্রেন-বাস সংঘর্ষ: টাকার বিনিময়ে গেটম্যানদের দায়িত্ব বদল, ঘটনার সময় ঘুমিয়ে ছিলেন দুজনই
কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে গত ২১ মার্চ রাতে দায়িত্ব পালনের কথা ছিল রেলওয়ের গেটম্যান মো. মেহেদী হাসান ও মো. হেলাল উদ্দিনের। কিন্তু কর্তৃপক্ষকে না জানিয়েই তারা পবিত্র ঈদুল ফিতর কাটাতে গ্রামের বাড়ি চলে যান। টাকার বিনিময়ে নাজমুল হোসেন ও কাউসার হোসেন নামের অন্য দুই গেটম্যানের সঙ্গে তারা নিজেদের দায়িত্ব বদল করেন। আর সেই দায়িত্ব বদলের বিনিময়ে টাকা নেওয়া দুই গেটম্যান নাজমুল ও কাউসার সেদিন রাতে ডিউটিরত অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।
জানা যায়, ট্রেন আসার সময় গেট ব্যারিয়ার (প্রতিবন্ধক) না ফেলায় রেলপথের ওপর যাত্রীবাহী বাস উঠে যায়। ফলে ট্রেনের সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষে তিন শিশুসহ ১২ জন যাত্রী নিহত হন।
ঘটনাটি ঘটেছিল গত ২১ মার্চ দিবাগত রাত ২টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং এলাকায়। চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্ষ্মীপুরগামী 'মামুন স্পেশাল' পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী 'মেইল ট্রেনের' এই সংঘর্ষ হয়। ট্রেনটি বাসটিকে প্রায় ৭০০ মিটার দূরে দৈয়ারা নামক স্থানে টেনে নিয়ে থামে।
এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বাসটি দুমড়েমুচড়ে ঘটনাস্থলেই ১২ জনের মৃত্যু হয় এবং চালকসহ অন্তত ২৪ জন গুরুতর আহত হন। হতাহতদের সবাই বাসের যাত্রী ছিলেন। এ ঘটনায় নিহত এক বাসযাত্রীর স্বজনের দায়ের করা মামলায় এখন পর্যন্ত ওই রেলক্রসিংয়ের তিন গেটম্যানকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব ও পুলিশ।
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে নেমে রেলওয়ের তদন্ত কমিটি চার গেটম্যানের গাফিলতির প্রমাণ পেয়েছে। তদন্তে জানা যায়, শুধু মানুষের ভুল নয়, যান্ত্রিক ত্রুটিও ছিল সমানভাবে দায়ী। দুর্ঘটনার সময় রেলক্রসিংয়ের অ্যালার্ম বাজেনি এবং আইপি ফোনটিও অকেজো ছিল। এছাড়া গেটম্যানদের তদারকি না করায় রেলওয়ের কুমিল্লার ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (পথ) আনিসুজ্জামানকে পরোক্ষভাবে দায়ী করা হয়েছে। সম্প্রতি রেলওয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও) আনিসুর রহমানকে প্রধান করে গঠিত ছয় সদস্যের বিভাগীয় তদন্ত কমিটি এবং কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি—উভয়ই দুর্ঘটনার জন্য প্রায় একই ধরণের কারণ চিহ্নিত করেছে। তদন্ত কমিটির প্রধান আনিসুর রহমান জানান, দুর্ঘটনার মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় রোধে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার চারটি প্রধান কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলো হলো- গেটম্যানদের নিয়মবহির্ভূতভাবে দায়িত্ব বদল, সময়মতো গেট ব্যারিয়ার না ফেলা, তদারকি কর্মকর্তার ব্যর্থতা ও বাসচালকের বেপরোয়া গতি।
গেটম্যান মো. হেলাল উদ্দিনের জবানবন্দির বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০ মার্চ (শুক্রবার) রাতের ডিউটি শেষ করে তিনি চাঁদপুরে গ্রামের বাড়ি চলে যান। পরদিন ২১ মার্চ রাতের দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি নাজমুল ও কাউসারকে এক হাজার টাকা দেন। কিন্তু তারা দায়িত্ব পালন না করে ঘুমিয়ে পড়লে এই ঘটনা ঘটে।
তদন্তে অবকাঠামোগত দুর্বলতার চিত্রও ফুটে উঠেছে। ক্রসিংয়ে বিদ্যুৎ না থাকায় অ্যালার্ম বেল ও আইপি ফোন কার্যকর ছিল না। এমনকি গেটকিপারদের ঘরে টয়লেট, পানি ও বিদ্যুতের ন্যূনতম ব্যবস্থাও ছিল না। প্রকৌশল বিভাগের এসব তদারকির কথা থাকলেও তারা চরম অবহেলা করেছেন। এছাড়া দূরপাল্লার বাসটির ফ্লাইওভার (উড়ালসড়ক) দিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও চালক নিচ দিয়ে রেলক্রসিং ব্যবহার করেছিলেন।
প্রতিবেদনে বাসচালককে দায়ী করে বলা হয়, চালক সতর্কতা নির্দেশক বোর্ড মানেননি এবং মোটরযান আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা লঙ্ঘন করে রেলক্রসিং পার হওয়ার চেষ্টা করেছেন। এছাড়া সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর নির্মিত দুটি ঘরের কারণে রেললাইন স্পষ্ট দেখা যায় না বলেও উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে, জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনে রেলওয়ে এবং সওজের মধ্যে সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করা হয়েছে। এতে গেটম্যানদের পাশাপাশি লালমাই রেলস্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার, ট্রেনচালক ও সহকারী ট্রেনচালকের অবহেলার বিষয়টিও উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পদুয়ার বাজার এলাকায় সওজের ইউলুপ নির্মাণের জন্য তৈরি ঘরগুলোর কারণে চালক ট্রেন দেখতে পাননি। তবে বাসচালকের অদক্ষতাও ছিল স্পষ্ট; ওভারপাস ব্যবহার না করে নিচ দিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তই এতগুলো মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।
