হাতের টানেই উঠে যাচ্ছে যশোর প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়কের কার্পেটিং, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ
একটি নবনির্মিত সড়কের পিচের কার্পেটিং হাত দিয়ে টেনে টেনে তুলছেন একজন। সেই কার্পেটিংয়ের দলা হাতে নিয়ে সামান্য চাপ দিতেই তা গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। এই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করছেন অন্য একজন। ভিডিওটিতে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে নিম্নমানের কাজের অভিযোগ তুলে সড়কটির স্থায়িত্ব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে শোনা যায় সেই ব্যক্তিকে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এমন একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
জানা গেছে, এই সড়কটি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) প্রধান ফটকের সামনের রাস্তা। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের একমাত্র পথ হওয়ায় প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় হাজার শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী যাতায়াত করেন। ভিডিওতে কার্পেটিং তুলতে দেখা ব্যক্তিরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী।
আজ মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সরেজমিনে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে কেন্দ্রীয় মসজিদ পর্যন্ত প্রায় ১০০ মিটার দীর্ঘ রাস্তা নির্মাণের কাজ চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে শুরু হয়।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে সড়কটি সংস্কারসহ দুপাশের ড্রেন, ফুটপাত কার্পেটিং ও ব্লক বসানোর জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৭ লাখ টাকা। তবে নির্মাণকাজ শেষ হতে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সময় লাগায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সাধারণ পথচারীদের চলাচলে দীর্ঘ ভোগান্তি পোহাতে হয়।
পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রাস্তার পাশে একটি ব্যানার টাঙিয়ে এক মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। সেই ব্যানার অনুযায়ী ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও মার্চ মাস পেরিয়ে গেলেও তা পুরোপুরি শেষ হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, নির্মাণকাজে দীর্ঘসূত্রতার কারণে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছালে যবিপ্রবি রেজিস্ট্রার কাজী মো. জালাল উদ্দীন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে নির্বাহী প্রকৌশলী তৌহিদ ইমামকে ঈদুল ফিতরের আগেই কাজ শেষ করার নির্দেশ দেয়া হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া এই কাজ তদারকির মূল দায়িত্বে ছিলেন উপ-প্রধান প্রকৌশলী নাজমুস সাকিব।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট সময়সীমা পার হওয়ার আশঙ্কায় তড়িঘড়ি করে সড়কটির কাজ শেষ করতে গিয়ে গুণগত মান নিশ্চিত করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। আজ দুপুরে এই প্রতিবেদকের সামনেই অনেক শিক্ষার্থীকে সড়কের কার্পেটিং হাত দিয়ে টেনে তোলেন।
এ বিষয়ে জিন প্রকৌশল ও জৈব প্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষার্থী সামিউল আলিম বলেন, 'একশো মিটার রাস্তা একশো দিন পার হলেও সঠিকভাবে সংস্কার করতে পারেনি। প্রয়োজনীয় উপকরণ ব্যবহার না করে তড়িঘড়ি করে দায়সারা কাজ করা হয়েছে। নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহারের কারণে রাস্তা শক্ত হয়নি। দুর্নীতি ও অনিয়ম ছাড়া এমন নিম্নমানের কাজ সম্ভব নয়।'
সুস্মিতা সরকার নামে অন্য এক শিক্ষার্থী বলেন, 'বিগত সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা অনিয়ম দুর্নীতি করেছে তাদের বিচার না হওয়াতে এখনও বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতি হচ্ছে। এই সড়কটি তার প্রমাণ। এখানে শুধু ঠিকাদার নয়; প্রশাসনের দায়িত্বরত কর্মকর্তারাও জড়িত। এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিচার ও সড়কটি নতুন করে সংস্কারের দাবি জানাচ্ছি।'
এদিকে ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী তৌহিদ ইমামকে বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যাচ্ছে না। আজও তার দপ্তরে তাকে পাওয়া যায়নি। তবে এর আগে ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের তিনি জানিয়েছিলেন, ক্যাম্পাসে যেসব বিআরটিসি বাস চলে, সেগুলোর তেলের ট্যাঙ্কে লিকেজ থাকার কারণে বাস থেকে ডিজেল চুইয়ে যেখানে যেখানে পড়েছে সেখানেই কার্পেটিং উঠে যাচ্ছে।'
কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল বাশার দাবি করেন, 'কাজে কোনো অনিয়ম হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী সরঞ্জাম দিয়েই সড়কটি সংস্কার হয়েছে।'
প্রধান প্রকৌশলী ড. মো. মোখলেসুর রহমান বলেন, 'আমরা দাঁড়িয়ে থেকে সড়কটির কাজ করেছি।' কাজের ত্রুটি কিংবা অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। সড়কটির কাজ এখনো শেষ হয়নি বলে জানান তিনি। তবে কী কারণে কার্পেটিং উঠে যাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলবেন বলেও তিনি জানান।
যবিপ্রবি রেজিস্ট্রার কাজী জালাল উদ্দীন বলেন, 'সড়কটির কার্পেটিং উঠে যাওয়ার বিষয়ে আমরা অবগত। কোনো অনিয়ম মেনে নেওয়া হবে না। তদন্ত করে কোনো অনিয়ম থাকলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
