লোডশেডিং মোকাবিলায় পোশাক খাতে কৌশলগতভাবে ডিজেল বরাদ্দের কথা ভাবছে সরকার
লোডশেডিংয়ের সময় কারখানার জেনারেটর সচল রাখতে বাণিজ্য সংগঠনগুলোর সুপারিশের ভিত্তিতে তৈরি পোশাক খাতের জন্য কৌশলগত ডিজেল বরাদ্দের পরিকল্পনা করছে সরকার।
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে এমনটা ভাবা হচ্ছে। সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম বেড়ে গেছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
কর্মকর্তা ও শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থায় কারখানাগুলোকে বাংলাদেশ গার্মেন্টস প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) কর্তৃক প্রত্যয়িত দৈনিক চাহিদার ভিত্তিতে ডিজেল সরবরাহ করা হবে।
সংগঠন দুই ইতোমধ্যেই তাদের সদস্য কারখানাগুলোর কাছ থেকে জেনারেটরের সক্ষমতা ও জ্বালানির চাহিদা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে শুরু করেছে।
রোববার জারি করা এক চিঠিতে বিজিএমইএ সদস্যদের ২ এপ্রিলের মধ্যে জেনারেটরের ব্যবহার, সক্ষমতা ও ডিজেলের প্রয়োজনীয়তার বিস্তারিত তথ্য জমা দিতে বলেছে। একই ধরনের নির্দেশনা দিয়েছে বিকেএমইএও।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান টিবিএসকে বলেন, "লোডশেডিং হলে স্ট্যান্ডবাই জেনারেটর চালাতে হয়, যার জন্য ডিজেল প্রয়োজন। বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে যাতে সব কারখানা প্রয়োজনীয় জ্বালানি পায়, সে জন্য বিজিএমইএর সুপারিশ অনুযায়ী সদস্য কারখানাগুলোতে ডিজেল সরবরাহের প্রক্রিয়া চলছে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।"
তিনি বলেন, "পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বিজিএমইএ যে কারখানার জন্য যতটুকু ডিজেলের সুপারিশ করবে, সংশ্লিষ্ট এলাকার পাম্প থেকে ততটুকুই সরবরাহ করা হবে। এজন্য সদস্যদের কাছে চিঠি দিয়ে কারখানায় ব্যবহৃত জেনারেটরের সক্ষমতা জানতে চাওয়া হয়েছে।"
"প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সর্বোচ্চ চার ঘণ্টা লোডশেডিং হলে একটি কারখানায় জেনারেটর চালাতে যতটুকু ডিজেল প্রয়োজন, ততটুকু দেওয়ার সুপারিশ করা হবে। কারণ আমরা চার ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হবে বলে মনে করছি না," যোগ করেন তিনি।
নিট পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মো. হাতেম টিবিএসকে বলেন, "আমরা সদস্যদের কাছে দৈনিক ডিজেলের চাহিদা জানতে চেয়ে চিঠি দিয়েছি। সেই অনুযায়ী প্রত্যয়ন দেওয়া হবে।"
তিনি আরও বলেন, "৩০ মার্চ রাত ১০টায় এ বিষয়ে আলোচনার জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী সময় দিয়েছেন। ওই বৈঠকে বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।"
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান টিবিএসকে বলেন, এ বিষয়ে ইতোমধ্যে জ্বালানি মন্ত্রী এবং নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সবাই ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। শিগগিরই সংগঠনের সুপারিশের ভিত্তিতে কারখানায় জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যবস্থা শুরু হবে।
তিনি আরও বলেন, "আমরা কারখানাগুলোর চাহিদা নির্ধারণের কাজ শুরু করেছি। তবে সবকিছু পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। ঈদের ছুটির পরই কারখানা চালু হয়েছে, তাই পরিস্থিতি বিবেচনায় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।"
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, যে কারখানা যেখানে অবস্থিত, তারা নিকটবর্তী পাম্প থেকে দিনে একবার ডিজেল সংগ্রহ করতে পারবে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর প্রত্যয়নের ভিত্তিতে পাম্পগুলো তেল সরবরাহ করবে।
বিপিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে প্রতিদিন প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার টন ডিজেল ব্যবহার হয়। এর প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহৃত হয় শিল্পকারখানায়। ডিজেলের বড় অংশ ব্যবহৃত হয় পরিবহন, সেচ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে।
বাংলাদেশ জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে পুরোপুরি আমদানি-নির্ভর। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানি করা হয়। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আসেনি। পরিশোধিত জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে।
একইভাবে এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রেও কাতার, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ। এই যুদ্ধের কারণে এলএনজির দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
বাংলাদেশে পরিবহন, কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানা পরিচালনায় ডিজেল ব্যবহৃত হয়। একইভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কারখানার বয়লার পরিচালনায় এলএনজি ব্যবহৃত হয়। বৈশ্বিক বাজারে এই দুই জ্বালানির সংকট তৈরি হওয়ায় দেশের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল পাচ্ছেন না গ্রাহকরা।
