পদ্মা থেকে টেনে তোলা হলো ডুবে যাওয়া বাস, অন্তত ২৫ জনের মরদেহ উদ্ধার
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাত্রীসহ পদ্মায় ডুবে যাওয়া বাসটি উদ্ধারকারী জাহাজ 'হামজা'র সহায়তায় টেনে তুলেছে ফায়ার সার্ভিস। এখন পর্যন্ত বাসটি থেকে ২৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
বুধবার (২৬ মার্চ) রাত সাড়ে ১২টার দিকে প্রায় ছয় ঘণ্টা চেষ্টার পর পানির নিচ থেকে বাসটি উদ্ধার করা হয়।
নিহতদের মধ্যে ফায়ার সার্ভিস ২২ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে। স্থানীয়দের মাধ্যমে উদ্ধার হওয়া আরও দুজনকে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এছাড়া নৌবাহিনীর ডুবুরিরা আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করেন।
এর মধ্যে ২২ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। তারা হলেন—
রেহেনা আক্তার (৬১), স্বামী—মৃত ইসমাঈল হোসেন খান, ভবানীপুর, রাজবাড়ী; মর্জিনা খাতুন (৫৬), স্বামী—মো. আবু বক্কর সিদ্দিক, মজমপুর, কুষ্টিয়া; রাজীব বিশ্বাস (২৮), পিতা—হিমাংশু বিশ্বাস, গড়বাড়ীয়া, কুষ্টিয়া; জহুরা অন্তি (২৭), পিতা—মৃত ডা. আবদুল আলীম, সজ্জনকান্দা রাজবাড়ী; কাজী সাইফ (৩০), পিতা—কাজী মুকুল, সজ্জনকান্দা, রাজবাড়ী; মর্জিনা আক্তার (৩২), স্বামী—রেজাউল করিম, চর বারকিপাড়া, ছোট ভাকলা, রাজবাড়ী; ইস্রাফিল (৩), পিতা—দেলোয়ার হোসেন, ধুশুন্দু, সমাজপুর, কুষ্টিয়া।
সাফিয়া আক্তার রিন্থি (১২), পিতা—রেজাউল করিম, চর বারকিপাড়া, ছোট ভাকলা, রাজবাড়ী; ফাইজ শাহানূর (১১), পিতা—বিল্লাল হোসেন, ভবানীপুর, বোয়ালিয়া, রাজবাড়ী; তাজবিদ (৭), পিতা—কেবিএম মুসাব্বির, সজ্জনকান্দা, রাজবাড়ী; আরমান খান (৩১), পিতা—আরব খান, পশ্চিম খালখোলা, বালিয়াকান্দি, রাজবাড়ী; নাজমিরা জেসমিন (৩০), স্বামী—আব্দুল আজিজ, কালুখালী, রাজবাড়ী; লিমা আক্তার (২৬), পিতা—সোবাহান মন্ডল, রামচন্দ্রপুর, মিজানপুর, রাজবাড়ী; জোস্ন্যা (৩৫), স্বামী—মান্নান মন্ডল, বড় চর বেনিনগর, রাজবাড়ী।
মুক্তা খানম (৩৮), স্বামী—মৃত জাহাঙ্গীর আলম, নোয়াধা, কোটালীপাড়া, গোপালগঞ্জ; নাছিমা (৪০), স্বামী—মৃত নূর ইসলাম, মথুয়ারাই, পার্বতীপুর, দিনাজপুর; আয়েশা আক্তার সুমা (৩০), স্বামী—মো. নুরুজ্জামান, বাগধুনিয়া পালপাড়া, আশুলিয়া, ঢাকা; সোহা আক্তার (১১), পিতা—সোহেল মোল্লা, রাজবাড়ী; আয়েশা সিদ্দিকা (১৩), পিতা—গিয়াসউদ্দিন রিপন, সমসপুর, খোকসা, কুষ্টিয়া;
আরমান (৭ মাস), পিতা—নুরুজ্জামান, খন্দকবাড়িয়া, শৈলকুপা, ঝিনাইদহ; আব্দুর রহমান (৬), পিতা—আব্দুল আজিজ, মহেন্দ্রপুর, কালুখালী, রাজবাড়ী; সাবিত হাসান (৮), পিতা—শরিফুল ইসলাম, আগমারাই, দাদশী, রাজবাড়ী; আহনাফ তাহমিদ খান (২৫), পিতা—ইসমাইল হোসেন খান, ভবানীপুর, রাজবাড়ী সদর।
এদিকে এখনো আনুমানিক আটজন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
উদ্ধার অভিযানে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ও ১০ জন ডুবুরি অংশ নেন। পাশাপাশি সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিআইডব্লিউটিএ, কোস্টগার্ড এবং স্থানীয় প্রশাসনের সদস্যরা যৌথভাবে উদ্ধার কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছেন।
মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় ঈদের আনন্দ শেষে ফিরতি যাত্রা বিষাদে পরিণত হয়েছে। অনেকেই হারিয়েছেন স্বজনদের। এখনও নিখোঁজের সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, বাসের বেশির ভাগ যাত্রী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঢাকায় ফিরছিলেন কাজে যোগ দিতে।
বাসটি নদীর ৭০ থেকে ৮০ ফুট গভীরে তলিয়ে গিয়েছিল বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের ফরিদপুর স্টেশনের সহকারী পরিচালক মো. বেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, উদ্ধারকারী জাহাজ 'হামজা'র মাধ্যমে বাসটি তোলা হয়। বৃষ্টি, বজ্রপাত ও নদীর ঢেউয়ের কারণে উদ্ধারকাজ কিছুটা ব্যাহত হয়।
এদিকে, স্ত্রী-সন্তানকে বাসের ভেতরে রেখে বেরিয়ে আসা আব্দুল আজিজসহ স্বজনহারাদের আহাজারিতে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।
চোখের সামনে স্ত্রী-সন্তানসহ বাসটি পদ্মায় ডুবতে দেখেন নুরুজ্জামান। বাসটি দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পৌঁছানোর পর তিনি চার বছরের মেয়েকে নিয়ে নেমে যান। তার স্ত্রী সাত মাসের ছেলেকে নিয়ে বাসেই ছিলেন। এ সময় বাসটি ফেরিতে ওঠার জন্য পন্টুনে ছিল।
নুরুজ্জামান বলেন, "তখনই বাসটি পন্টুন থেকে চলন্ত অবস্থায় নদীতে পড়ে যায়। বাসে আমার স্ত্রী-সন্তান ছিল। তারা বের হতে পারেনি।"
তিনি বলেন, "ঈদের ছুটি শেষে ঢাকায় ফেরার জন্য স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসে উঠেছিলাম। পথে আরও কয়েকটি স্থান থেকে যাত্রী ওঠে।"
দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া ৮ বছর বয়সী আলিফ জানায়, "বাস ফেরিতে ওঠার সময় হঠাৎ পদ্মায় পড়ে যাচ্ছিল। তখন আমি মায়ের কোলে ছিলাম। মা আমাকে জানালা দিয়ে বের করে দেন।"
ঈদের ছুটি শেষে মায়ের সঙ্গে ঢাকায় ফিরছিল সে। আলিফ আরও জানায়, "আমি সাঁতার কেটে ওপরে উঠি, কিন্তু আমার মাকে আর খুঁজে পাচ্ছি না।"
এদিকে, দুর্ঘটনাটি তদন্তে রাজবাড়ী জেলার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এছাড়া নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মহিউদ্দিন ইসলামের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিকেও তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
