ঘরমুখী যাত্রীদের ভিড়ে চিরচেনা রূপে ফিরেছে সদরঘাট, বাস টার্মিনালেও বাড়ছে যাত্রীর চাপ
ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছেন ঘরমুখো মানুষ। ঈদের আগে শেষ কর্মদিবসে রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ফিরেছে পুরোনো ব্যস্ততা। একই সঙ্গে বাস টার্মিনালগুলোতেও যাত্রীদের আনাগোনা বেড়েছে। আর দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ঘরমুখো যাত্রায় ঢাকা–মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতেও বাড়তে শুরু করেছে যানবাহনের চাপ।
সোমবার (১৬ মার্চ) রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল, গাবতলী ও মহাখালী বাস টার্মিনাল এবং ঢাকা–মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে।
সদরঘাটে ফিরছে সেই পুরোনো ব্যস্ততা
ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ধীরে ধীরে ফিরছে পুরোনো ব্যস্ততা। ঈদের আগে আজই ছিল শেষ কর্মদিবস। এদিন লঞ্চ টার্মিনালে যাত্রীদের ভিড় দেখা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনো প্রত্যাশিত সংখ্যক যাত্রী না এলেও আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে যাত্রীদের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
লঞ্চ টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে যাত্রীরা বরিশাল, ভোলা, চাঁদপুর, পটুয়াখালীসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় যাওয়ার জন্য ঘাটে আসছেন। ঘাটে কুলি-মজুরদের উপস্থিতিও আগের তুলনায় বেশি। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও পরিবার-পরিজন নিয়ে বাড়ি ফেরা মানুষের সংখ্যাই বেশি দেখা গেছে। ঈদের আগে ভিড় এড়াতে অনেকে আগেভাগেই যাত্রা শুরু করছেন।
সাধারণ সময়ে বরিশাল রুটে এক বা দুটি লঞ্চ চলাচল করলেও বর্তমানে যাত্রীর চাহিদা বাড়ায় চারটি লঞ্চ ছাড়ছে।
লঞ্চ শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে ঢাকা-বরিশাল রুটে ডেকের ভাড়া ৩০০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিন এক হাজার ২০০ টাকা এবং ডাবল কেবিনের ভাড়া ২ হাজার ৪০০ টাকা।
এছাড়া বিভিন্ন ভিআইপি কেবিনের ভাড়া ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। ঢাকা থেকে মুলাদি ও ভাসানচর রুটে ডেকের ভাড়া ৪০০ টাকা এবং কেবিন ভাড়া এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকা।
অন্যদিকে চাঁদপুর রুটে ডেকের ভাড়া ২০০ টাকা এবং কেবিন ভাড়া ৫০০ থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে।
চাঁদপুরগামী আল বোরাক লঞ্চের টিকিট বিক্রেতা জমির উদ্দিন জানান, এখনো ডেকে যাত্রীর চাপ কম। কেবিনে কিছু যাত্রী রয়েছে। আজ সন্ধ্যা থেকে যাত্রীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে পারে।
চরফ্যাশনগামী লঞ্চের স্টাফ আবদুল বলেন, ঈদের সময় ছাড়া বছরের অন্য সময় লঞ্চগুলো প্রায় ফাঁকাই থাকে। ঈদ ঘিরে কিছুটা ব্যস্ততা ফিরে আসে।
পরিবার নিয়ে ঢাকা থেকে বরিশাল যাচ্ছিলেন সাইফুল ইসলাম। বেলা বাড়লে ভিড় বাড়বে বলে আগেভাগেই বাড্ডা থেকে এসেছেন তারা। তিনি বলেন, 'ভিড় এড়াতেই আগেভাগে বাড়ির পথে রওনা হয়েছি।' ভাড়াও আগের মতোই রয়েছে।
অন্যদিকে ভোলাগামী যাত্রী আশরাফুল রহমান বলেন, 'বর্তমানে কিছুটা ভিড় দেখা যাচ্ছে। তবে সাধারণ সময়ের তুলনায় কেবিনের ভাড়া কিছুটা বেশি পড়েছে। তিনি জানান, সিঙ্গেল কেবিনের জন্য খরচ পড়েছে ১ হাজার টাকা । যেখানে সাধারণ সময়ে এর কমেও টিকিট পাওয়া যায়।
পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলে সড়কপথে যাত্রীদের যাতায়াত বাড়ায় সদরঘাটের ব্যস্ততা আগের তুলনায় কমেছে। তবে ঈদসহ বড় উৎসবের সময় আবারও ঘাটে যাত্রী ও কর্মব্যস্ততার সেই পুরোনো চিত্র কিছুটা হলেও ফিরে আসে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ কর্তৃপক্ষের পরিচালক একেএম আরিফ উদ্দিন টিবিএসকে বলেন, 'এবারে ঈদ উপলক্ষে আমরা যাত্রীদের সুবিধার কথা ভেবেছি। নতুন ট্রলি সরবরাহ করেছি মালামাল বহনের জন্য। আজ শেষ কর্মদিবসে যাত্রীদের ভিড় কিছুটা বেড়েছে। এছাড়া পদ্মা সেতুর কারণে সাধারণত সদরঘাটে সেই আগের মতো যাত্রীদের চাপ আর দেখা যায় না।'
বাস টার্মিনালে বাড়ছে যাত্রীদের আনাগোনা
মহাখালী বাস টার্মিনালে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার যাত্রীদের ভিড় বাড়তে শুরু হয়েছে। টার্মিনালে গাইবান্ধা যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন আব্দুল আলীম। তিনি টিবিএসকে বলেন, পাঁচ দিন আগে টিকিট কেটেছি পলি পরিবহনের। বাস ভাড়া ৭৫০ টাকা নিচ্ছে। আগে ৬০০ টাকা করে যেতে পারতাম।
যদিও কাউন্টারে নির্ধারিত ভাড়ার তালিকায় গাইবান্ধার ভাড়া ৭৫০ টাকাই উল্লেখ করা ছিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপস্থিত ড্রাইভার শফিকুল বলেন, টিকিটের দাম আগেও এটাই ছিল। তবে বাস খালি যেত। এ কারণে কিছু টাকা কম দিয়ে যাত্রী নেওয়া হতো। কিন্তু ইদের সময় তো খালি আসতে হয়। এ কারণে কম নেওয়া সম্ভব নয়।
তেলের সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'ভোর চারটায় দাঁড়িয়ে সন্ধ্যা ছয়টায় তেল পেয়েছি। ৮০ লিটার তেল নিয়েছি ১১ হাজার টাকায়। ৫০ লিটারের বেশি দেবে না। এ কারণে বাড়তি তেল নিয়েছি ঘুষ দিয়ে। তারপরেও তো আমরা ভাড়া বেশি নিচ্ছি না।'
এদিকে রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালে দুপুর পর্যন্ত যাত্রীদের তেমন ভিড় দেখা যায়নি। তবে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিকেলের পর থেকে যাত্রীদের চাপ বাড়তে পারে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৭, ১৮ ও ১৯ মার্চের অগ্রিম টিকিট ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। তবে যাত্রীদের জন্য বিশেষ গাড়ির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
ঈদ উপলক্ষে যাত্রীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), পুলিশ, সিটি কর্পোরেশন এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক ইউনিয়নের সমন্বয়ে একটি ভিজিল্যান্স টিম টার্মিনালে অস্থায়ী ক্যাম্প বসিয়েছে।
এ বিষয়ে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সুকান্ত সাহা বলেন, "যাত্রী হয়রানি যেন না হয় এবং নির্ধারিত ভাড়ার বেশি না নেওয়া হয়, সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে।"
সাকুরা পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার ফারুক হোসেন বলেন, "১৭ থেকে ১৯ মার্চের টিকিট বিক্রি শেষ। তবে তেলের সরবরাহ নিয়ে কিছুটা শঙ্কা রয়েছে।"
ভিড় বেড়েছে সায়েদাবাদ ও ধোলাইপাড় বাস টার্মিনালেও
গতকাল রোববার সকাল থেকে সায়েদাবাদ ও ধোলাইরপাড় বাস টার্মিনালে যাত্রীর চাপ বেশ বেড়েছে। সায়েদাবাদ থেকে সিলেট, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে বাস ছেড়ে যায়।
আজ টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, কাউন্টারের সামনে যাত্রীদের ভিড়। আবার কেউ কেউ টিকিট কিনে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছেন।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন মোহাম্মদ রাসেল। ব্যস্ততার কারণে তিনি অগ্রিম টিকিট কাটতে পারেননি। তার বাড়ি গোপালগঞ্জ। সেখানকার টিকিট না পেয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি খুলনাগামী একটি বাসের টিকিট কাটেন।
তিনি বলেন, "আগে থেকে টিকিট কাটতে পারিনি। তাই খুলনার বাসের টিকিট নিয়েছি। বাস ছাড়তে এখনো চার ঘণ্টা বাকি, তাই এখানে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।"
পরিবহনকর্মী দেবাশীষ বালা জানান, আজ সকাল থেকেই যাত্রীর চাপ বাড়তে শুরু করেছে। দুপুর পর্যন্ত বরিশাল ও খুলনার বাসগুলো স্বাভাবিকভাবেই ছেড়েছে। তবে বিকেলে ভিড় আরও বাড়বে বলে মনে হচ্ছে।
ঢাকা–মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে বাড়ছে যানবাহনের চাপ
ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ঘরমুখো যাত্রায় ঢাকা–মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতেও যানবাহনের চাপ বাড়তে শুরু করেছে।
সোমবার দুপুরের পর থেকেই এক্সপ্রেসওয়েতে যাত্রীবাহী বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি ও পণ্যবাহী যানবাহনের সংখ্যা বাড়তে দেখা গেছে। তবে এখন পর্যন্ত যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সেতু কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, বিকেল ৪টার পর থেকে সড়কে গাড়ির চাপ ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে। সন্ধ্যা এবং আগামীকাল ভোরের দিকে যানবাহনের চাপ আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হাসাড়া হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ টি এম মাহামুদুল হক জানান, ঢাকা–মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে দুটি মোবাইল টিম ও চারটি পেট্রোল টিমসহ মোট ছয়টি দল সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে।
তিনি বলেন, "যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাত্রা নিশ্চিত করতে মহাসড়কে নিয়মিত টহল ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হয়েছে।"
