সংসদের শোকপ্রস্তাবে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্তদের নাম: রাজনৈতিক দল ও বিশিষ্টজনদের তীব্র নিন্দা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপিত শোকপ্রস্তাবে দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর মোর্চা 'গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট', প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর মোর্চা 'গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট' এবং দেশের বিশিষ্ট নাগরিক সমাজ। পৃথক পৃথক বিবৃতিতে তাঁরা এই ঘটনাকে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের রক্তের সাথে 'বিশ্বাসঘাতকতা' হিসেবে উল্লেখ করে অবিলম্বে সংসদের কার্যবিবরণী থেকে ওই নামগুলো প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
শুক্রবার (১৩ মার্চ) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর মোর্চা গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই একাধিক নক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে, যা জাতির মুক্তিযুদ্ধ ও ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের সাথে প্রকাশ্য বিশ্বাসঘাতকতা। জোটের নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সংসদের শোকপ্রস্তাবে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যায় অংশগ্রহণকারী আলবদর-রাজাকার বাহিনীর দণ্ডিত সদস্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এমনকি মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী এটিএম আজহারুল ইসলামকে সংসদের সভাপতিমণ্ডলীর প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা সংসদের মর্যাদাহানি এবং শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রীয় অবমাননা।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিএনপি নির্বাচনের আগে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে জনগণের কাছে ভোট চাইলেও এখন যুদ্ধাপরাধীদের নাম প্রস্তাব করে তারা পুরনো চরিত্রের পরিচয় দিয়েছে। বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন জোটের কেন্দ্রীয় নেতা ও বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দনসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
এদিকে ছয়টি বাম ছাত্রসংগঠনের মোর্চা গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট এক যৌথ বিবৃতিতে এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, "যে শোকপ্রস্তাবে শহীদ আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধ, ফারহান ফাইয়াজদের মতো জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বীরদের স্মরণ করা হয়েছে, সেই একই শোকপ্রস্তাবে একাত্তরের গণহত্যাকারীদের নাম কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।" তারা আরও বলেন, বিএনপি নির্বাচনের আগে নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি দাবি করলেও তাদের চিফ হুইপ চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের নাম শোকপ্রস্তাবে উত্থাপন করায় জনগণের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে।
একই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে বিশিষ্ট নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে কবি নির্মলেন্দু গুণসহ ৩৫ জন একটি বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, সদ্য শপথ গ্রহণ করা বিএনপি সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে আবারও লজ্জাজনক ইতিহাস তৈরি হতে দেখলাম। শহীদদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত সংসদে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী ও খুনিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ৩০ লক্ষ শহীদের অবমাননা। তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, জুলাই চেতনার নাম করে একাত্তরকে মুছে ফেলার ঘৃণ্য অপচেষ্টা শুরু হয়েছে।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী বিশিষ্ট নাগরিকদের মধ্যে আরও রয়েছেন অধ্যাপক আবু ইউসুফ, কবি হেনরী স্বপন, শাহেদ কায়েস, মানিক বৈরাগী, লেখক শাহাদাত রাসেল, কবি ও কলামিস্ট মীর রবিসহ ৩৫ জন লেখক, কবি ও মানবাধিকার কর্মী। তাঁরা অবিলম্বে জাতীয় সংসদের কার্যবিবরণী থেকে এই শোকপ্রস্তাবের অংশটুকু প্রত্যাহার করার জোর দাবি জানান এবং ভবিষ্যতে এমন বিতর্কিত পদক্ষেপ না নিতে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেন।
