মিডিয়ার চাপেই জজ মিয়া নাটক হয়েছে: আইজিপি
কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটার পর সুষ্ঠু তদন্তের জন্য গণমাধ্যমের চাপ সৃষ্টি না করে পুলিশকে প্রয়োজনীয় 'রেসপন্স টাইম' দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের নবনিযুক্ত মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। ২০০৪ সালের আলোচিত 'জজ মিয়া নাটক' মিডিয়ার অতিরিক্ত চাপের কারণেই তৈরি হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
তিনি বলেন, 'মিডিয়া যদি অতিরিক্ত চাপ দেয়, তখন পুলিশের ওপর মানসিক চাপ তৈরি হয়। ফলে অনেক সময় তড়িঘড়ি করে যেটা পাওয়া যায় সেটার ওপর ভিত্তি করে স্বীকারোক্তি নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। জজ মিয়া নাটকও মিডিয়া প্রেসারের কারণেই তৈরি হয়েছিল বলে আমি মনে করি।'
সোমবার (৯ মার্চ) পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া সেন্টারে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় সমসাময়িক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও পুলিশের ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন আইজিপি।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলার পর জজ মিয়া নামের এক নিরীহ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। তাকে ১৭ দিন রিমান্ডে রেখে ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে সাজানো স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছিল বলে পরে প্রমাণিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতেই এই 'নাটক' সাজানো হয়েছিল।
দীর্ঘ ২১ বছর পর সেই ঘটনার উদাহরণ টেনে বর্তমান আইজিপি বলেন, 'কোনো ঘটনা ঘটলে সংবাদমাধ্যম অনেক সময় এমনভাবে প্রশ্ন তোলে যেন সঙ্গে সঙ্গে তার বিচার শেষ করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে কোনো কোনো হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটনে ২০ থেকে ২৫ বছর সময়ও লেগে যায়।'
আইজিপি সতর্ক করে বলেন, ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা আর না ঘটে, সে বিষয়ে পুলিশ কাজ করবে।
সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে আইজিপি জানান, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, 'মন্ত্রণালয় থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। এ বিষয়ে কার্যক্রম চলছে। আশা করি খুব শিগগিরই তাদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে পারব।'
চাঁদাবাজ ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের বিষয়ে আইজিপি বলেন, বিভিন্ন সংস্থা থেকে পাওয়া তালিকা যাচাই-বাছাই করে কমন নামগুলো শনাক্ত করা হচ্ছে। অচিরেই তাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হবে।
৭ মার্চের ভাষণ বাজানোর অভিযোগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে তিনজনকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ প্রধান বলেন, পুলিশ কোনো 'অতি উৎসাহী' ভূমিকা পালন করবে না। তবে নাগরিকদের অবশ্যই আইন মেনে চলতে হবে এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না।
তিনি বলেন, 'নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের সদস্যরা যদি বিভিন্ন অজুহাতে রাস্তায় নেমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় বা সন্ত্রাসকে উসকে দেয়, তাহলে তা বরদাশত করা হবে না।'
'মব সন্ত্রাস' প্রসঙ্গে আইজিপি বলেন, 'দেশে বেকারত্বের কারণে যেকোনো কর্মসূচিতে সহজেই লোক জড়ো করা সম্ভব হয়। অনেক ক্ষেত্রে মাদক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকে। অনেকে আবার ফায়দা লুটার জন্য লুটপাট বা অপকর্মের উদ্দেশ্যে মব তৈরি করে।'
তিনি হুশিয়ার করে বলেন, 'আমরা মূল মব সংগঠকদের তালিকা তৈরি করছি। তারা যত ক্ষমতাবানই হোক, আইনের আওতায় আনা হবে।'
পুলিশ প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বড় চ্যালেঞ্জ কী—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশের নাগরিকদের মধ্যে আইন মানার প্রবণতা কমে গেছে। তিনি বলেন, 'এখন সবাই কোনো ঘটনা ঘটলেই রাতারাতি বিচার চায়।'
আইজিপি জানান, দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য প্রতিটি থানায় একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দেওয়া হয়েছে। এতে জমি বা আর্থিক বিরোধসহ বিভিন্ন সমস্যা দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।
পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি জানান, বিষয়টি সরকার পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে।
কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্যে থাকা রাজনৈতিক ব্যক্তিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোই দেশের নীতি নির্ধারণ করে। তবে কেউ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সবশেষে আইজিপি 'জুলাই বিপ্লব' নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, 'জুলাই বিপ্লব কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। যারা এটাকে ব্যবহার করে ফায়দা লুটতে চায় তাদেরও শনাক্ত করা হবে। দেখা যাচ্ছে, অনেকেই এখন বড় জুলাই বিপ্লবী সেজে যাচ্ছে, অথচ তারা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িতই ছিল না।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরাও (পুলিশ) রাজপথে ছিলাম। জুলাই বিপ্লব কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।'
বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার আড়ালে কেউ কেউ জুলাই বিপ্লবকে খাটো বা ধ্বংস করার চেষ্টা করছে অভিযোগ করে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান আইজিপি।
