সরবরাহ স্বাভাবিকের দাবি, তবু দূরপাল্লার ট্রিপ কমাচ্ছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পেট্রোল পাম্পে অস্বাভাবিক ভিড় দেখা গেছে। সরকার প্রতিদিন যানবাহনভেদে জ্বালানি নেওয়ার নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দিলেও এবং কর্মকর্তারা দূরপাল্লার যানবাহনের জন্য কোনো প্রকৃত সংকট নেই বলে দাবি করলেও, পরিবহন সংশ্লিষ্টরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
জ্বালানি সরবরাহে সীমাবদ্ধতা ও দীর্ঘ লাইনের কারণে অনেক পরিবহন ঢাকার বাইরে যাতায়াত কমিয়ে দিয়েছে। কেউ কেউ যাত্রা পিছিয়ে দিচ্ছে এবং স্বাভাবিকের তুলনায় কম ট্রিপ চালাচ্ছে। ঢাকার বাস টার্মিনালগুলো থেকেও কম সংখ্যক বাস ছেড়ে যাচ্ছে। জ্বালানির অনিশ্চয়তার মধ্যে নির্ভরযোগ্যতা ও খরচ সামাল দিতে এখন অনেক পরিবহন পূর্ণ যাত্রী না হওয়া পর্যন্ত বাস ছাড়ছে না।
কল্যাণপুরে গ্রামীণ ট্রাভেলসের কাউন্টার ম্যানেজার রাকিব টিবিএসকে বলেন, "আমাদের বাসগুলো আপাতত ঠিকই চলছে, এখন পর্যন্ত বড় কোনো সমস্যা হয়নি। তবে আমরা কিছু ট্রিপ কমিয়ে দিয়েছি। আগে যেসব বাস অর্ধেক যাত্রী নিয়ে বের হয়ে যেত, এখন সেগুলো কিছুটা সময় নিয়ে পুরো যাত্রী ভর্তি করে তারপর ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। কারণ তেল পাওয়া নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা আছে।"
এতে ভোগান্তি বেড়েছে যাত্রীদের। বাসের অপেক্ষায় কাউন্টারে দীর্ঘ সময় বসে থাকতে হচ্ছে অনেককে।
কল্যাণপুরে বাসের জন্য অপেক্ষা করা যাত্রী শিরীন বেগম টিবিএসকে বলেন, "রোজা রেখে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে বসে আছি। কাউন্টার থেকে বারবার বলা হচ্ছে বাস আসছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত বাস আসার কোনো খবর নেই।"
ধোলাইখাল ট্রাক স্ট্যান্ডে গিয়েও একই চিত্র দেখা গেছে। ট্রাকচালক মো. আশরাফ জানান, "দূরে যাওয়ার মতো তেল পাম্প থেকে নেওয়া যাচ্ছে না। দুই-একদিন ধরে কাছাকাছি রুটেই গাড়ি চালাচ্ছি। আয়-রোজগার কমে যাচ্ছে।"
সায়দাবাদ বাস টার্মিনালে গোল্ডেন লাইন বাসের ম্যানেজার ঈসমাইল মিয়া জানান, "সকাল থেকে তেলের কারণে গাড়ি চলাচল কম ছিল। দুপুরের দিকে অবশ্য চাপ কিছুটা বেড়েছে। অনেক পাম্প বন্ধ থাকছে। আবার আগে থেকে তেল মজুত করেও রাখা যাচ্ছে না।"
শ্যামলী এনআর পরিবহনের ম্যানেজার আক্তার হোসেনও একই সমস্যার কথা জানান। তিনি বলেন, "পাম্প থেকে প্রয়োজন মতো তেল নেওয়া যাচ্ছে না। মালিকেরা গাড়ি কমিয়ে দিচ্ছেন। ধরুন, আমার দরকার ১৪০ লিটার তেল, কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে ৭০-৮০ লিটার। এতে সমস্যাই হচ্ছে।"
খুলনায় জ্বালানির চাহিদা বেড়েছে পাঁচ গুণ
গুজব ও আতঙ্কের কারণে খুলনার জ্বালানি তেল ডিপোগুলোতে হঠাৎ করে চাহিদা প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে গেছে। ফলে নগরীর দৌলতপুর এলাকায় অবস্থিত পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির ডিপোগুলোতে ট্যাঙ্ক লরির চাপ বেড়েছে। পাম্পগুলোতেও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তেল বিক্রি হচ্ছে। বাস ও ট্রাকসহ পরিবহন খাতের অনেক চালককে লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ডিপো সূত্র জানায়, সাধারণ সময়ে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল উত্তোলন হতো, বর্তমানে তার চেয়ে বেশি তেল নিতে পাম্প মালিকরা ডিপোতে আসছেন। তবে দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই; গুজবের কারণেই অস্বাভাবিক চাহিদা তৈরি হয়েছে।
নগরীর ফুলবাড়ীগেট এলাকার মেসার্স নগর পেট্রোলিয়াম সার্ভিস স্টেশনের ম্যানেজার মো. মাহফুজ বিশ্বাস বলেন, "প্রতিদিন আমাদের স্টেশন থেকে পেট্রোল, ডিজেল ও অকটেন মিলিয়ে সাড়ে পাঁচ হাজার লিটারের বেশি তেল বিক্রি হয় না। কিন্তু গুজবের কারণে তা বেড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার লিটারে পৌঁছেছে। অনেকে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত তেল নিতে আসছে। কেউ কেউ আবার বাড়তি তেল নেওয়ার জন্য পাত্রও নিয়ে আসছে।"
মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ডেপুটি ম্যানেজার হাবিবুর রহমান বলেন, "তেলের চাহিদা প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। আগে যে পাম্প সপ্তাহে ২০ লাখ টাকার তেল নিত, তারা এখন কোটি টাকার তেল নিচ্ছে। তবে তেল বাইরে পাচার হচ্ছে না—সাধারণ মানুষের কাছেই মজুত থাকছে।"
অন্যদিকে পাম্পে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে পরিবহন খাতের চালকদের ভোগান্তিও বেড়েছে। খুলনা-যশোর মহাসড়কে চলাচলকারী একটি বাসের চালক আব্দুল করিম বলেন, "পাম্পে গেলে আগের মতো সহজে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে সময়মতো গাড়ি ছাড়তে সমস্যা হচ্ছে।"
ট্রাকচালক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, "আগে ১০-১৫ মিনিটে তেল নিয়ে চলে যেতে পারতাম। এখন পাম্পে লাইন থাকে। কখনও আবার সীমিত তেল দেওয়া হচ্ছে। এতে পণ্য পরিবহনে দেরি হচ্ছে।"
বাস সুপারভাইজার রহমত আলী জানান, "পাম্প থেকে পুরো ট্যাংক ভরতে পারছি না। অল্প তেল নিয়ে রুটে যেতে হচ্ছে। এতে মাঝপথে আবার তেল নিতে হচ্ছে। সব পাম্পে তেলও পাচ্ছি না। এই ভোগান্তির শেষ কোথায়, জানিনা।"
রাজশাহীতে তেল সংকটের শঙ্কা
রাজশাহীতে তেল সংকটের শঙ্কায় গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। শনিবার সকালে নগরীর কুমারপাড়া এলাকার গুল গফুর পেট্রোলিয়াম স্টেশনে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকা কয়েকজন গ্রাহককে পাম্প মালিকপক্ষের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়াতেও দেখা গেছে।
পরিবহন মালিকরা বলছেন, এখন পর্যন্ত তেলের প্রকৃত কোনো সংকট দেখা দেয়নি। তবে পাম্প মালিকরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন বলে তাদের অভিযোগ।
রাজশাহী সড়ক পরিবহন গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম হেলাল বলেন, "তেলের কোনো সংকট নেই। আমাদের পরিবহন খাতে এখনো কোনো সমস্যা তৈরি হয়নি। সব বাস ঠিকভাবেই চলাচল করছে। তবে পাম্প মালিকরা কৃত্রিম সংকট দেখানোর চেষ্টা করছেন।"
এদিকে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন জানান, কৃষি জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য জ্বালানি তেলের কোনো সংকট এখনো দেখা দেয়নি।
তিনি বলেন, "মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।"
বগুড়ায় ডিজেলের সংকট নেই
বগুড়াসহ দেশের উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় পেট্রোল ও অকটেনের ঘাটতি থাকলেও বাস ও ট্রাকের জন্য ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে।
বগুড়া থেকে ঢাকামুখী বাস চালান মো. সোহান শেখ। তিনি জানান, পাম্পগুলোতে তেল সংকট হবে—এমন গুজব ছড়িয়েছে। তবে ডিজেলের কোনো সংকট নেই। বগুড়ার একটি পাম্প থেকে নিয়মিত তেল পাওয়া যাচ্ছে এবং দামও বাড়েনি।
বগুড়া থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে সবজি পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী রেদোয়ান রাকিব বলেন, তার তিনটি ট্রাক নিয়মিত খাদ্যপণ্য পরিবহন করে। এখন পর্যন্ত পাম্পগুলোতে তেল স্বাভাবিকভাবেই পাওয়া যাচ্ছে।
নওগাঁর শাকিব ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক আল আমিন বলেন, সাধারণ সময়ে তাদের স্টেশনে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার লিটার জ্বালানি তেল মজুত থাকে। কিন্তু হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সেই মজুত দ্রুত কমে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আপাতত শুধু যানবাহনের ট্যাংকে তেল দেওয়া হচ্ছে; আলাদা পাত্রে তেল বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে।
সিলেটে ডিজেলের মজুত নিয়ে ভিন্ন তথ্য
অকটেন ও পেট্রোলের সংকট দেখা দিলেও ডিজেল সরবরাহ এখনো স্বাভাবিক আছে বলে জানিয়েছেন সিলেট ট্রাক মালিক সমিতির প্রচার সম্পাদক শাব্বির আহমদ ফয়েজ।
তিনি বলেন, "এখন আমরা পর্যাপ্ত ডিজেল পাচ্ছি। তবে এই অবস্থা কতদিন থাকবে তা নিশ্চিত নই। চালকদের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক আছে।"
এদিকে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রোলিয়াম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় মহাসচিব ও সিলেট বিভাগীয় কমিটির সভাপতি জুবায়ের আহমদ চৌধুরী জানান, সিলেটের প্রায় ৮০ শতাংশ পাম্পে ডিজেল ফুরিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, "শুক্র ও শনিবার ডিপো বন্ধ থাকে। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাত থেকেই ক্রেতাদের চাপ বেড়েছে। ফলে পেট্রোল ও অকটেন দ্রুত শেষ হয়ে গেছে। আশা করছি রোববার ডিপো থেকে সরবরাহ শুরু হলে সোমবারের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।"
তিনি আরও বলেন, সিলেটের গ্যাসক্ষেত্র থেকে উপজাত হিসেবে পেট্রোল ও অকটেন পাওয়া যায়, কিন্তু ডিজেল আমদানি করতে হয়। তাই দেশে ডিজেলের প্রকৃত মজুদ কত আছে তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বড় কোনো প্রভাব নেই
তেলের বাজারে অস্থিরতা থাকলেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এখনো বড় কোনো প্রভাব পড়েনি। যাত্রীবাহী বাস ও ট্রাক স্বাভাবিকভাবেই পাম্পগুলো থেকে জ্বালানি নিতে পারছে। নৌযানগুলোর ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহর থেকে আখাউড়া, কসবা, নবীনগর, আশুগঞ্জ ও হবিগঞ্জের মাধবপুর রুটে প্রতিদিন কয়েকশ যাত্রীবাহী বাস চলাচল করে। প্রতিটি বাসের একেকটি রুটে যাওয়া-আসা মিলিয়ে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়।
জেলা বাস মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. হানিফ বলেন, "এখন পর্যন্ত আমাদের বাসগুলো স্বাভাবিকভাবেই পাম্প থেকে জ্বালানি নিতে পারছে। কোনো সংকটে পড়তে হয়নি। তবে সামনে যদি তেলের সংকট দেখা দেয়, তখন এর প্রভাব পড়বে। তখন স্বাভাবিকভাবেই ভাড়া বাড়তে পারে।"
এদিকে নৌপথেও জ্বালানি নিয়ে কোনো সংকট দেখা যায়নি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ মোকামে দূর-দূরান্ত থেকে নৌকায় করে ধান নিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। তারা সরকার নির্ধারিত দামেই ডিজেল পাচ্ছেন।
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের ব্যবসায়ী অবিনাশ বেপারী বলেন, "গতকাল কিশোরগঞ্জ থেকে আসার সময় ডিজেল কিনেছিলাম, তখন চাহিদা মতোই পেয়েছি। আজ ধান বিক্রি করে আশুগঞ্জ থেকে ৩০ লিটার ডিজেল কিনেছি। তেল পেতে কোনো সমস্যা হয়নি।"
