ঈদযাত্রায় এবারেও ভোগাতে পারে যমুনা সেতু ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক
সরকারের পক্ষ থেকে এবারের ঈদে ঘরমুখী মানুষের যাত্রায় স্বস্তিদায়ক ভ্রমণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও যমুনা সেতুর কাছে অসম্পূর্ণ চার লেন, ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে টোল আদায় ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়নে ধীরগতির কারণে তীব্র যানজটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে ও ঢাকা বাইপাস সড়ক দিয়ে যাতায়াতকারী যাত্রীরা তুলনামূলক কম ভোগান্তিতে পড়তে পারেন।
মঙ্গলবার (৩ মার্চ) শুরু হয়েছে ঈদযাত্রায় দূরপাল্লার বাসের আগাম টিকেট বিক্রি। সাধারণত ২০ রমজানের পর মহাসড়কে ঘরমুখী মানুষের চাপ বাড়তে থাকে।
তবে সরকার বলছে, এবারের ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক হবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থালোর ঈদের প্রস্তুতিমূলক অভ্যন্তরীণ সভায় মহাসড়কগুলোর বেশ কিছু জায়গায় পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কার কথা উঠলেও কর্মকর্তাদের দাবি, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন হবে।
গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সড়কমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, 'অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে ঈদযাত্রা স্বস্তির ও নিরাপদ হবে। এজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিতে মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।'
তিনি আরও জানান, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজট এড়াতে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। 'অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
অন্যতম ভোগান্তির নাম যমুনা সেতু
উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ঢাকার অন্যতম সংযোগস্থল রাজধানীর আমিনবাজার সেতুর কারণে যাত্রীদের তীব্র যানজটে পড়তে হতো।
তবে আমিনবাজারে চার লেনের সেতুর পাশাপাশি সম্প্রতি আট লেনের দ্বিতীয় আমিনবাজার-গাবতলী সেতু এবং আন্ডারপাস নির্মাণের পর সে ভোগান্তি অনেকটাই কমে এসেছে।
কিন্তু উত্তরবঙ্গের ২০-২২টি জেলার মানুষের ভোগান্তি ও দুর্ভোগের অন্যতম নাম সিরাজগঞ্জের যমুনা সেতুর পশ্চিম সংযোগ মহাসড়কের ১৯ কিলোমিটার অংশ।
টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত সাড়ে ১৩ কিলোমিটার চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের কাজ চলছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। তিন বছর পেরিয়ে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও এখন পর্যন্ত কাজ হয়েছে মাত্র ৫০ শতাংশ।
এতে বিভিন্ন সময়ে এ মহাসড়ক দিয়ে যাতায়াতকারীদের পড়তে হয় দুর্ভোগে। বিশেষ করে ঈদযাত্রায় যানজটে দুর্ভোগের মাত্রা বাড়ে কয়েকগুণ। এবারের ঈদেও যানজট ভোগাবে বলে এই রুটে যাতায়াতকারীরা শঙ্কা প্রকাশ করছেন।
দেশের অন্যতম বৃহৎ মহাসড়ক ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের জয়দেবপুর থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত রাস্তার চার লেনের কাজ শেষ হওয়ায় এই অংশ নির্বিঘ্নেই যাতায়াত করতে পারছেন উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের ২৪ জেলার যাত্রীরা। কিন্তু এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত চার লেন প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
এই রুটে নিয়মিত যাতায়াতকারী সিরাজগঞ্জের বাসিন্দা জিয়াউল হক টিবিএসকে বলেন, 'টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু অংশের রাস্তার কাজ শেষ হলে আমাদের ভোগান্তি অনেকটাই কমে যেত। কিন্তু এখনও কাজ চলায় পুরো রাস্তায় গাড়ি চলাচল করতে পারছে না।
'এছাড়া যমুনা সেতুর টোল প্লাজার ম্যানুয়াল পদ্ধতির উন্নতি হয়নি। এই অংশে ইনোভেশন না আনলে টোল প্লাজাতেই ২-৩ ঘণ্টা বসে থাকতে হয়।'
এদিকে রমজান ও ঈদকে ঘিরে ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাত্রা নিশ্চিত করতে সিরাজগঞ্জের ব্যস্ততম মহাসড়কে বিশেষ এস্কট সেবা চালু করেছে সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশ । জেলা পুলিশ মঙ্গলবার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ঢাকা-উত্তরবঙ্গ মহাসড়ক হিসেবে পরিচিত যমুনা সেতু পশ্চিম মহাসড়কে যানজট নিরসন, ডাকাতি প্রতিরোধ ও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে রমজান ও ঈদকে ঘিরে ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাত্রা নিশ্চিত করতে সিরাজগঞ্জের ব্যস্ততম মহাসড়কে বিশেষ এসকর্ট সেবা চালু করেছে সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশ।
জেলা পুলিশ মঙ্গলবার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ঢাকা-উত্তরবঙ্গ মহাসড়ক হিসেবে পরিচিত যমুনা সেতু পশ্চিম মহাসড়কে যানজট নিরসন, ডাকাতি প্রতিরোধ ও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গাজীপুরে রাস্তার ধারের বাজারে যানজট প্রকট
ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গের যাত্রীদের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হলো ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক। ঈদে এই সড়কে, বিশেষ করে ঢাকার মহাখালী থেকে গাজীপুর পর্যন্ত যাত্রীদের তীব্র যানজটে পড়তে হয়। গাজীপুর থেকে ময়মনসিংহমুখী রাস্তায় সাধারণত যান চলাচল স্বাভাবিক থাকে।
স্বাভাবিক সময়ে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় চার ঘণ্টা। তবে ঈদের সময় এ যাত্রাসময় বেড়ে দাঁড়ায় ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা।
মহাসড়ক ঘেঁষে গড়ে ওঠা বাজারসহ অবৈধ স্থাপনা ও সড়কের দুর্বল ব্যবস্থাপনা যানজটের অন্যতম কারণ । এসব কারণে প্রায়ই গাজীপুরে তীব্র যানজটের সূত্রপাত ঘটে।
মঙ্গলবার (৩ মার্চ) গাজীপুরের শ্রীপুরে মহাসড়কের লেন দখল করে বাজার ইজার দেওয়ার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়নে ধীরগতি
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের সিলেট অংশে তেমন অগ্রগতি নেই। ভূমি অধিগ্রহণসহ নানা জটিলতায় কাজ চলছে ধীরগতিতে, যা আসন্ন ঈদযাত্রায় এ রুটের যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়াবে।
প্রকল্পের তথ্যমতে, চলতি বছরের ডিসেম্বরে কাজ বাস্তবায়নের কথা থাকলেও এ সময়ের আগে তা শেষ হওয়া নিয়ে রয়েছে শঙ্কা। প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও আশানুরূপ অগ্রগতি নেই এখনো।
সিলেটের শেরপুর থেকে তামাবিল পর্যন্ত ৯২ কিলোমিটারের মধ্যে ২ বছরে কাজ হয়েছে মাত্র ১৪ শতাংশ। এছাড়া মহাসড়কের দুপাশে চলমান ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণসহ নানা উন্নয়নমূলক কাজের কারণে রাস্তায় চলাচল করা যানবাহনগুলো ভোগান্তিতে পড়ছে।
ঢাকা-সিলেট ছয় লেন প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক দেবাশীষ রায় বলেন, ঠিকাদারকে জমি বুঝিয়ে দেওয়ার পর, তাদেরকে তিন বছর সময় দিতে হয়। এ কারণে প্রকল্পটি সম্পন্ন হতে সময় বেশি লাগছে।
প্রধান মহাসড়কগুলোর যানজটপ্রবণ এলাকা
এবারও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নবীনগর পর্যন্ত এবং নবীনগর-বাইপাইল-চন্দ্রা মহাসড়কে যানজট ভোগাতে পারে ঈদযাত্রায়।
এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাড়কের নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ অংশ, নিমসার বাজার এলাকা, কুমিল্লা বিশ্বরোড এলাকাসহ বেশ কিছু অংশে যানজটে ভোগান্তির শঙ্কা রয়েছে।
গৃহীত পদক্ষেপসমূহ
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রণালয় থেকে ১৫ রমজানের মধ্যে সড়কের সব মেরামত কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মহাসড়কে ঈদের আগে তিন দিন, ঈদের দিন ও ঈদের পরে তিন দিনসহ মোট ৭ দিন রড, বালু, সিমেন্ট, পাথরবাহী ট্রাক চলাচল বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানি পরিবহন স্বাভাবিক থাকবে।
হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. দেলোয়ার হোসেন মিঞা বলেন, 'আশা করা যায় এবার ঈদযাত্রা আগের চেয়ে স্বস্তিদায়ক হবে। ইতিমধ্যে প্রায় সাড়ে তিন হাজার পুলিশ সদস্য মহাসড়কে মোতায়েন করা হয়েছে। সড়কে চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
