বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে মৃত্যু, ঈদে আর দেশে ফেরা হলো না তারেকের
আসন্ন ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার আনন্দ পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চেয়েছিলেন আবুল মহসিন তারেক। দীর্ঘ ৩২ বছরের প্রবাস জীবন শেষে এবার লম্বা সময়ের জন্য দেশে থাকার পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না৷
সোমবার (০২ মার্চ) ভোরে বাহরাইনের 'আরব শিপবিল্ডিং অ্যান্ড রিপেয়ার ইয়ার্ড'-এ 'স্টেনা ইম্পেরেটিভ' নামক একটি জাহাজে কর্মরত অবস্থায় ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে প্রাণ হারান সন্দ্বীপের এই রেমিট্যান্স যোদ্ধা। যে মানুষটির ফেরার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছিল পরিবার, এখন সবাই তার নিথর দেহের অপেক্ষায়৷
তারেকের আকস্মিক মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি একা হয়ে পড়েছেন তার একমাত্র সন্তান তাসনিম তামান্না। বেপজা পাবলিক স্কুল ও কলেজের একাদশ শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর কাছে তার বাবা ছিলেন পুরো পৃথিবী। তামান্না শোকাচ্ছন্ন কণ্ঠে বলেন, 'আমার বাবা নেই এটা আমি কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছি না। সবশেষ রোববার (১ মার্চ) ইফতারের আগে ভিডিও কলে হাসিমুখে বাবা আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। একদিনের ব্যবধানে বাবা কীভাবে নেই হয়ে গেলেন? বাবা আমাকে সারা জীবনের জন্য একা করে দিয়ে চলে গেছেন।'
ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে তামান্না আরও বলেন, 'আমাদের কোনো ভাইবোন নেই, এই পুরো ঘর এখন খালি হয়ে গেল। বাবা না থাকলে আমাদের এই সংসার কীভাবে চলবে, আমার পড়াশোনাই বা কীভাবে হবে, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।'
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৩ সালে মাধ্যমিক পাসের পরে সংসারের হাল ধরতে প্রবাসে পাড়ি জমান তারেক। দীর্ঘ ৩২ বছর একনাগাড়ে পরিশ্রম করে তিনি সাধারণ পদ থেকে পদোন্নতি পেয়ে সিনিয়র সুপারভাইজার হয়েছিলেন।
সন্দ্বীপে তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার পর অনেক কষ্টে পরিবারকে চট্টগ্রাম শহরের হালিশহরে থিতু করেছিলেন তিনি।।চট্টগ্রামের বৌ বাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকত তার পরিবার৷
নিহতের চাচাতো ভাই এবং রাউজান পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মো. শামসুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, 'তারেকের মরদেহ দেশে ফেরানোর জন্য আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি। কিন্তু বর্তমানে ওই দেশের পরিস্থিতি মোটেও ভালো নয়, যার কারণে মরদেহ আনা নিয়ে আমরা উদ্বেগের মধ্যে আছি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে আমরা সবাই এখন দিশেহারা। দীর্ঘ প্রবাস জীবনে সে পরিবারের জন্য যা করেছে, তার প্রতিদান এভাবে মৃত্যু দিয়ে হবে তা কখনো ভাবিনি। আমরা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জরুরি সহযোগিতা কামনা করছি।'
দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, নিহতের সহকর্মী ও জেঠাতো ভাই নূর হোসেন বেলাল সেই ভয়াবহ মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে বলেন, 'আমি সামান্য দূরে কাজ করছিলাম। হঠাৎ বিকট বিস্ফোরণের শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। আমি দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি জাহাজের ভেতরে ড্রোন বা মিসাইলের ছিটকে পড়া টুকরো পড়ে আছে। আমার ভাই তখন জাহাজের ওপরের অংশে মেরামতের কাজ করছিলেন; সেই ধ্বংসাবশেষ সরাসরি তার মাথায় আঘাত করে। ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান।'
তারেকের দীর্ঘদিনের রুমমেট ও প্রতিবেশী সোলাইমান নোয়াব স্মৃতিচারণ করে বলেন, 'তারেক ছিল অত্যন্ত দয়ালু এবং অমায়িক স্বভাবের মানুষ। যতবার সে দেশে আসত, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের জন্য উপহার নিয়ে আসত। সোমবার ভোর ৫টার দিকে যখন মৃত্যুর খবরটা পেলাম, তখন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারিনি। আমাদের দাবি, সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানি যেন এই অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ায় এবং তাদের অপূরণীয় ক্ষতির জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করে।'
নিহতের আত্মীয় রিয়াজ উদ্দীন সৌরভ জানান, তারেক তখন ডিউটিতে ছিলেন এবং তার এক ভাই একই কর্মস্থলে থাকায় দ্রুত খবরটি তারা জানতে পারেন। তিনি বলেন, 'খবর পাওয়ার পর থেকেই আমরা বাহরাইনের বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। যে মানুষটির ঈদে আনন্দ নিয়ে ঘরে ফেরার কথা ছিল, এখন তার নিথর দেহটা দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনতে হচ্ছে আমাদের। পুরো পরিবার এখন শোকস্তব্ধ।'
