এলপিজি আমদানি ৪৪ শতাংশ বাড়লেও খুচরা বাজারে স্বস্তি নেই
জানুয়ারির তুলনায় চলতি মাসে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে গত কয়েক সপ্তাহের সরবরাহ সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে খুচরা বাজার এখনো স্বাভাবিক না হওয়ায় ভোক্তাদের সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামেই কিনতে হচ্ছে এলপিজি।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে বিকল্প উৎস থেকে এলপিজি আমদানি করা হয়েছে। এসব চালান ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ দেশে পৌঁছাবে। এতে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং আগামী সপ্তাহগুলোতে দাম কমতে পারে বলেও আশা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম ও মোংলা কাস্টমস স্টেশনের তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রায় ৯১ হাজার টন এলপিজি আমদানি করেছে, যা জানুয়ারির একই সময়ে ছিল ৬৩ হাজার টন। অর্থাৎ, আমদানি প্রায় ৪৪ শতাংশ বেড়েছে।
এই দুই বন্দরের পাশাপাশি সীতাকুণ্ডে বেসরকারি জেটিগুলোর মাধ্যমে প্রতি মাসে আরও ২০ থেকে ২২ হাজার টন এলপিজি আমদানি করা হয়।
তবে খুচরা বাজারে এর প্রভাব এখনো সীমিত। খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, পরিবেশকরা সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার সরবরাহ করছেন। অন্যদিকে পরিবেশকদের দাবি, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আমদানি কমে যাওয়ায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
আমদানি বাড়লেও ঢাকাসহ চট্টগ্রামে ভোক্তাদের এখনো ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের জন্য ১,৬০০ থেকে ১,৭০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে—যা সরকার নির্ধারিত ১,৩৫৬ টাকার চেয়ে অনেক বেশি।
রাজধানীর কিছু খুচরা দোকানে ১২ কেজির সিলিন্ডার ১,৮০০ থেকে ২,৫০০ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে—যা জানুয়ারিতে সংকটের সময়ে ওঠা দামের মতোই। ওই সময় প্রতি সিলিন্ডার ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকায় পৌঁছেছিল।
খুচরা বিক্রেতারা জানান, তারা পরিবেশকদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের (এলওএবি) সভাপতি আমিরুল হক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, বর্তমান আমদানির পরিমাণ বিবেচনায় ভোক্তা পর্যায়ে বড় ধরনের কোনো ঘাটতি নেই।
তিনি বলেন, "আমদানিকারকেরা সরকার নির্ধারিত মূল্যেই বিক্রি করছেন, কিন্তু খুচরা পর্যায়ে এসে দাম বেড়ে যাচ্ছে।"
তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে কোম্পানিগুলো বিকল্প উৎস থেকে এলপিজি সংগ্রহে ঝুঁকছে।
তিনি বলেন, "বিকল্প সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আমদানি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং দ্রুতই সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।"
আগের আমদানি কমে যাওয়ার সঙ্গে বর্তমান সংকটের যোগসূত্র
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় গত নভেম্বর মাসে এলপিজি আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়—যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৪ শতাংশ কম। মেঘনা গ্রুপ ও ডেল্টা এলপিজিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আমদানি বাড়ানোর অনুমোদন না পাওয়ায় ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতেও আমদানি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেনি।
পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় জানুয়ারিতে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়। পরে এই ঘাটতি মোকাবিলায় আমদানি বাড়ানোর অনুমতি দেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম, মোংলা ও সীতাকুণ্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ১৭ লাখ ৫৪ হাজার টন এলপিজি আমদানি করেছে। বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫,০০০ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে এলপিজি বাজারে মোট ২৮টি কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে—যার মধ্যে ২৩টি কোম্পানির আমদানির অনুমোদন রয়েছে। চলতি অর্থবছরে ১৬টি কোম্পানি সক্রিয়ভাবে আমদানি কার্যক্রম চালিয়েছে এবং এর মধ্যে ৯টি কোম্পানি মোট আমদানির ৯২ শতাংশ সরবরাহ করেছে।
বেক্সিমকোসহ অন্তত চারটি কোম্পানি আমদানি কার্যক্রম স্থগিত করায় সক্রিয় কোম্পানিগুলোকে আমদানি বাড়াতে হয়েছে।
নতুন এলপিজির চালান আসছে
প্রায় ১০ হাজার টন এলপিজি বহনকারী তিনটি ট্যাংকার বর্তমানে সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের পথে রয়েছে। দেশের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) পাঁচটি জাহাজে করে ৫৭ হাজার টন এলপিজি চট্টগ্রামের উদ্দেশে আসছে।
প্রায় ২৪ হাজার টন এলপিজি বহনকারী তিনটি ট্যাংকার ২৬ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এছাড়া আরও ৩৩ হাজার টন এলপিজি বহনকারী দুটি জাহাজ মার্চের প্রথমার্ধে দেশে পৌঁছাবে।
এমজিআইয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নিয়মিত উৎসের পাশাপাশি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ভিয়েতনাম, তাইওয়ান ও মালয়েশিয়া থেকেও এলপিজি আমদানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, "এই চালানগুলো আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে দেশে পৌঁছাবে এবং সরবরাহ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।"
ইউনাইটেড আইগ্যাস, যমুনা স্পেসটেক ও ওমেরা পেট্রোলিয়ামসহ অন্যান্য আমদানিকারকরাও আমদানি বাড়িয়েছে।
চট্টগ্রামের বাজারে এখনো চাপ অব্যাহত
চট্টগ্রামে সরেজমিনে দেখা গেছে, সরবরাহ কিছুটা উন্নত হলেও বাজারে এখনো চাপ রয়েছে। কিছু এলাকায় পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ অনিয়মিত থাকায় এলপিজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে এবং দামও এখনো বেশি।
ষোলশহর, ২ নম্বর গেট, চকবাজার, আতুরার ডিপো ও টেকনিক্যাল এলাকার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত মাসের তুলনায় সিলিন্ডারের প্রাপ্যতা কিছুটা বেড়েছে। তবে দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
ষোলশহর এলাকার আশরাফিয়া ট্রেডিংয়ে প্রতিদিন ২০০টির বেশি সিলিন্ডারের চাহিদা থাকলেও এর প্রায় ৭০ শতাংশ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির মালিক মোহাম্মদ শামীম জানান, তিনি পরিবেশকদের কাছ থেকে ১২ কেজির সিলিন্ডার ১,৫০০ টাকায় কিনে ১,৬০০ টাকায় বিক্রি করছেন—যদিও মঙ্গলবার সরকার নির্ধারিত মূল্য ছিল ১,৩৪১ টাকা।
তিনি বলেন, "পরিবেশকদের কাছ থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে কেউই সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করছে না।"
ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ
বাংলাদেশের এলপিজি বাজার পুরোপুরি বেসরকারি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। দেশে বছরে প্রায় ১৭ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। নিবন্ধিত ৫২টি কোম্পানির মধ্যে ৩২টির প্ল্যান্ট রয়েছে, তবে মাত্র ২৩টি কোম্পানির আমদানির সক্ষমতা আছে। গত বছর নিয়মিতভাবে আমদানি কার্যক্রম চালিয়ে গেছে মাত্র আটটি কোম্পানি।
পরিবেশকদের দাবি, আগে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আমদানি কমে যাওয়ায় সরবরাহে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখনো বাজারে রয়েছে।
এলপিজি ডিস্ট্রিবিউটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি খোরশেদুর রহমান বলেন, শহর এলাকায় প্রতিদিন ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার সিলিন্ডারের চাহিদা রয়েছে, তবে এখনো সরবরাহ প্রায় ৩০ শতাংশ কম।
তিনি অভিযোগ করেন, সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলেও কিছু ব্যবসায়ী সুযোগ নিয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন।
ভোক্তারা বলছেন, সীমিত সরবরাহের কারণে তাদের দরকষাকষির সুযোগ নেই। আগ্রাবাদ, হালিশহর, মুরাদপুর ও জামালখান এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তারা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনছেন। কেউ কেউ এর চেয়েও বেশি দাম দিয়েছেন।
পাঁচলাইশ থানার কাটালগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা জামশেদ উদ্দিন বলেন, দোকানে সরবরাহ সীমিত থাকায় তিনি ১,৬৫০ টাকা দিয়ে একটি সিলিন্ডার কিনেছেন।
মূল্য নিয়ন্ত্রণ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে এলপিজির খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে। তবে এই মূল্য বাস্তবায়নে কার্যকর নজরদারির ঘাটতি থাকায় ভোক্তাদের মধ্যে তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালনা করলেও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, তারা একদিকে পরিবেশকদের কাছ থেকে বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন, অন্যদিকে গ্রাহকদের চাপের মুখে পড়ছেন।
চকবাজারের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হোসেন বলেন, পরিবেশকদের কাছ থেকে বেশি দামে কিনতে হলেও গ্রাহকেরা উচ্চমূল্যের জন্য খুচরা বিক্রেতাদেরই দায়ী করেন।
পরিবেশক সাইফুল ইসলাম বলেন, বেশি ক্রয়মূল্য ও আগের আমদানি সংকটের কারণে অনেক বিক্রেতাকে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করতে হয়েছে। তবে তিনি আশা করছেন, ধীরে ধীরে বাজার স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
তিনি বলেন, "আমদানি নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকলে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে দাম কমতে শুরু হতে পারে।"
