নির্বাচনের প্রভাবে বসন্ত-ভালোবাসা দিবসেও বিক্রি কম, ক্ষতির মুখে যশোরের ফুলচাষিরা
বিশ্ব ভালোবাসা দিবস এবং বসন্তের আগমনী দিনকে কেন্দ্র করে ফুলের বেচাকেনায় ব্যস্ত সময় পার করার কথা ছিল 'ফুলের রাজধানী' খ্যাত যশোরের গদখালীর ফুলচাষী ও ব্যবসায়ীদের। কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে বাজার বন্ধ থাকায় গদখালীতে এবার সেই চিরচেনা কর্মব্যস্ততা নেই। ফলে প্রায় কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন ফুল চাষিরা। কাঙ্ক্ষিত সময়ে ফুল বিক্রি করতে না পেরে চাষিদের মুখে আজ বিষাদের ছায়া।
জেলার ঝিকরগাছার গদখালী-পানিসারা অঞ্চলের চাষিরা সাধারণত বসন্ত বরণ ও ভালোবাসা দিবসের ব্যাপক চাহিদা ও ভালো দামের আশায় ফুল চাষে বিপুল বিনিয়োগে করেন। কিন্তু এ বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের প্রভাবে বাজার-ঘাট বন্ধ থাকায় তারা তাদের উৎপাদিত ফুল বিক্রি করতে পারেননি বলে জানিয়েছেন।
প্রতিদিন ভোরে গদখালীতে দেশের অন্যতম বৃহৎ ফুলের হাট বসে। গদখালী-পানিসারা অঞ্চলে উৎপাদিত ফুল সাধারণত রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের মোট চাহিদার ৩৫-৪০ শতাংশ পূরণ করে। বাকি ফুল দেশের অন্যান্য জেলা শহর এবং স্থানীয় পানিসারা-হাড়িয়া মোড়ে বিক্রি হয়।
সরেজমিনে শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) গদখালী এলাকায় দেখা গেছে, হাড়িয়া, সৈয়দপাড়া, পটুয়াপাড়া ও পানিসারার মাঠগুলোতে তারার মতো ফুল ফুটে রয়েছে। বিশেষ করে রজনীগন্ধা, গ্লাডিউলাস, জারবেরা ও গোলাপের খেতে ফুলের সমারোহ চোখে পড়ার মতো। তবে নির্বাচনের কারণে বাজার ব্যবস্থা ও পরিবহন চলাচল সীমিত হওয়ায় চাষিরা রজনীগন্ধা ও গ্লাডিউলাসের মতো ফুটে থাকা ফুলগুলো সঠিক সময়ে সংগ্রহ করতে পারেননি।
কয়েকজন চাষি কিছু গোলাপ সংগ্রহ করে কোল্ডস্টোরেজে রাখলেও বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে গোলাপের যে ব্যাপক চাহিদা ও চড়া দাম থাকে, তা থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছেন। বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পানিসারা মাঠের ফুলচাষি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, 'এ বছর আমার দুই বিঘা জমিতে জারবেরার শেডে প্রায় সাত হাজার ফুল কাটার মতো রয়েছে। বাজার বন্ধ থাকায় এসব ফুল বিক্রি করতে পারিনি। যার দাম অন্তত লাখ টাকা। তাছাড়া, চন্দ্রমল্লিকা, গাঁদাসহ অন্যান্য ফুলের চাষও রয়েছে। আজকে গদখালী বাজারে অল্প কিছু ফুল নিয়ে গিয়েছিলাম কিন্তু সঠিক দাম পাইনি। ভোটে বাজার বন্ধ থাকায় আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে গেল।'
পটুয়াপাড়া গ্রামের শাহ জামাল আক্ষেপ করে বলেন, 'গোলাপ ফুল একদিন পরপর উঠাতে হয়। বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে সবচেয়ে বেশি দামে গোলাপ বিক্রি করা যায়, কিন্তু এবছর ভোটের কারণে তা হলো না ।'
হাড়িয়া গ্রামের এরশাদ আলীর অবস্থা আরও করুণ। তিনি বলেন, 'নির্বাচনের কারণে বাজার বন্ধ থাকায় ফুল তুলতে না পেরে গাঁদা ফুল গরু দিয়ে খাইয়ে দিয়েছি।'
গদখালী ফুলচাষি ও ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সহসভাপতি মো. মনজুর আলম বলেন, 'মৌসুমের শুরুতে ফুল চাষিরা ভালো দাম পাচ্ছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের কারণে কয়েকদিন বেচাকেনা বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাছাড়া পানিসারা-হাড়িয়া ফুল মোড় বন্ধের কারণে প্রতিদিন অনেক টাকা লোকসান হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।'
যশোর ফুল উৎপাদক ও বিপণন সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি আব্দুর রহিম বলেন, 'এবারের ঋতুরাজ বসন্ত আর বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে শত কোটি টাকার ফুল বিক্রির প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু নির্বাচনের কারণে ফুলের বাজার ও পরিবহন বন্ধ থাকায় সেটি সম্ভব হয়নি। সাধারণত ফেব্রুয়ারির ৭ তারিখ থেকে এসব দিবসের ফুল বিক্রি শুরু হয়। কিন্তু ৯ তারিখ থেকে আইন-শৃঙ্খলা ঠিক রাখতে প্রশাসনের নির্দেশে ফুলের বাজার বন্ধ হওয়ায় মাত্র তিন দিন চাষিরা ফুল বিক্রি করতে পেরেছেন। সেক্ষেত্রে সব মিলিয়ে হয়তো কয়েক কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে। তাছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশে পানিসারা-হাড়িয়া ফুল মোড়ও বন্ধ করে দেয়। এতে করে বেচাকেনা না করতে পেরে চাষি ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।'
উল্লেখ্য, ঝিকরগাছার গদখালী অঞ্চলে বর্তমানে ৮০০ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ১১ ধরনের ফুল চাষ হচ্ছে। এই এলাকার প্রায় ছয় হাজার পরিবারের লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ফুল চাষের সঙ্গে জড়িত। প্রতিবছর এই অঞ্চল থেকে সাড়ে তিন-চারশ' কোটি টাকার ফুল উৎপাদিত ও বাজারজাত করা হয়।
