নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় প্রভাবক প্রায় ৫ কোটি তরুণ ভোটার
দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে জয়-পরাজয়ের বড় প্রভাব এখন তরুণ ভোটারদের হাতে।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি। বিশাল এই তরুণ জনশক্তিই ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দেওয়ার প্রধান নিয়ামক হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। জাতীয় যুবনীতি ২০১৭ অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী নাগরিকদের 'যুব' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
ইসির বয়সভিত্তিক উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৮-২১ বছরে ৮৫ লাখ ৩১ হাজার ৫৩৮ জন, ২২-২৫ বছরে ১ কোটি ১৯ লাখ ৬২ হাজার ১০৬ জন, ২৬-২৯ বছরে ১ কোটি ২১ লাখ ৬৬ হাজার ১৬২ জন এবং ৩০-৩৩ বছরে ১ কোটি ৬ লাখ ৮৬ হাজার ৬১৫ জন ভোটার রয়েছেন। সব মিলিয়ে তরুণ ভোটার সংখ্যা প্রায় ৫ কোটির কাছাকাছি।
সারাদেশে মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩জন বেশি। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার প্রায় ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন এবং নারী ভোটার প্রায় ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন। এছাড়া হিজড়া ১২৩২ জন। মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
তরুণ ভোটারদের চাওয়া-পাওয়া প্রথাগত রাজনীতির তুলনায় ভিন্ন। তারা কর্মসংস্থান, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। ডিজিটাল প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত এই প্রজন্ম প্রার্থীদের ব্যক্তিগত যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বিবেচনায় ভোট দিতে পারেন।
বিশ্লেষকদের মতে, তরুণরা যেদিকে ঝুঁকবেন, নির্বাচনের নাটাই সেদিকেই ঘুরবে।
সাবেক নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সদস্য ও ইসি সচিবালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন তুলি বলেন, 'তরুণ ভোটার সবাই একদিকে ভোট দেবেন—এমনটা ভাবার সুযোগ নেই। তরুণরা পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে থাকে। কেউ পরিবারের মত অনুসরণ করবে, কেউ নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেবে। তাই তাদের ভোট এককভাবে কোনো একটি দলে যাবে—এটা বলা ঠিক নয়।'
নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ ১১ ফেব্রুয়ারি এক ব্রিফিংয়ে বলেন, 'ভোটার তালিকা আইনে পরিবর্তন এনে কমিশন এবার তিন মেয়াদে ভোটার তালিকা প্রস্তুত করেছে। ভোটার তালিকায় ৪ কোটির বেশি তরুণ ভোটার রয়েছে, যাদের অনেকেই গত তিন নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি। এবার তাদের অনেকে প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন।'
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আব্দুর রহমানেল মাসউদ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, '১২ তারিখের ভোটে টার্নআউট কমপক্ষে ৬০ শতাংশের কম হবে না, এমনকি এর চেয়েও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।'
তিনি বলেন, 'মানুষের মধ্যে ভোটকে ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ভোট দেওয়ার আগ্রহ লক্ষণীয়।'
তরুণদের প্রত্যাশা রংপুরের ভোটার ও ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সারিফুজ্জামান সরিফ বলেন, 'আমাদের প্রত্যাশা অনেক। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেন ঠিক থাকে, ভোটের সময় যেন নির্ভয়ে ভোট দিতে পারি। আমি মনে করি, এবার একটি ভালো ভোট হবে।'
প্রথমবারের ভোটার রোকসানা ফেরদৌস বলেন, 'নির্ধারিত দলের প্রতীক নয়, প্রার্থীর যোগ্যতা দেখে ভোট দেব। যোগ্য ব্যক্তি সংসদ সদস্য হলে সেটাই দেশের জন্য ভালো।'
রাঙামাটির ভোটার তুনি চাকমা বলেন, 'আমরা আশা করছি এবার সবচেয়ে ভালো নির্বাচন হবে। জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট হবে, তাই গ্রামে মক ভোটের আয়োজন করলে জনসচেতনতা বাড়বে।'
সিইসির বার্তা
সম্প্রতি 'জেন ভোট ফেস্টিভ্যাল' অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, 'তরুণরা শুধু নিজেরা ভোট দেবেন না, অন্যদেরও ভোটদানে উৎসাহ দেবেন। তরুণরা সাহস ও সৃষ্টির প্রতীক। আপনাদের ছাড়া দেশ গড়া সম্ভব নয়। আগামী নির্বাচন হবে সুষ্ঠু, সুন্দর ও স্বচ্ছ।'
সবমিলিয়ে, প্রায় ৫ কোটি তরুণ ভোটারকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে এবারের নির্বাচনি কৌশল।
বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণই নির্ধারণ করবে আগামীর ক্ষমতার মানচিত্র। জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোট হবে একই দিনে।
ইসি জানায়, নিবন্ধিত ৬০ টি দলের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫০টি দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ ২৯৯টি আসনে দুই হাজার ২৮ জন প্রার্থী অংশগ্রহণ করছেন।
আগামী ১২ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। তবে নির্ধারিত সময় শেষে কেন্দ্রের চৌহদ্দির মধ্যে ভোটার উপস্থিত থাকলে তাদের ভোটগ্রহণ করা হবে বলে ইসি জানায়।
