নির্বাচনে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা ও প্রত্যাশা: নারী ভোটারদের ভাবনা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজধানীসহ সারাদেশে নিরাপত্তা ও ভোটার অংশগ্রহণ নিয়ে উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নারী ভোটাররা বিশেষভাবে সচেতন; কারণ নিরাপদ ভোটকেন্দ্র, যাতায়াতের নিরাপত্তা এবং নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে আশঙ্কা তাদের ভোটদানে প্রভাব ফেলতে পারে। নিরাপত্তাজনিত এই আশঙ্কা অনেকের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধা সৃষ্টি করলেও, নির্বাচিত সরকারের প্রতি তাদের প্রত্যাশাও রয়েছে।
রাজধানী ও আশপাশের কয়েকটি এলাকায় কথা বলে জানা যায়, প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাওয়া তরুণীদের মধ্যে আগ্রহ থাকলেও নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। নির্বাচনি আমেজের মধ্যে নিরাপত্তা ভাবনা শেষ মুহুর্তে নারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী অয়ন্তিকা বিশ্বাস বলেন, 'আমার শঙ্কা নির্বাচনের পর আসলে কী হবে সেটা নিয়ে। এখন তো সব ঠিকই আছে। এখন তো ভোট আদায়ের জন্য রাজনৈতিক দলগুলো সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কথা বলছে, ক্ষমতায় গেলে প্রতিশ্রুতি কতখানি রক্ষা হয় সেটাই দেখার বিষয়।'
গৃহিণী ও কর্মজীবী নারীদের মধ্যেও একই ধরনের উদ্বেগ দেখা গেছে। বিশেষ করে খুব সকালে কেন্দ্রে যাতায়াত, ভিড়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি, কিংবা রাজনৈতিক কর্মীদের উপস্থিতি নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
রাজধানীর মিরপুর এলাকার গৃহিণী নাজিফা ঢাকা–৬ আসনের ভোটার। জীবনে প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাবেন। তবে নিরাপত্তা নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না নাজিফা।
তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস)- বলেন, 'এবারের ভোটটা অন্যরকম। কাল নিরাপত্তা কেমন থাকবে এখনও বুঝতে পারছি না। কেন্দ্রে বেশি নারী পুলিশ ও আলাদা সারি থাকলে স্বস্তি লাগে। কোনো গণ্ডগোল না হোক সেইটাই আশা এখন।'
নির্বাচনি পরিবেশে উৎসবের আবহ অনুভব করলেও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা কাটেনি অনেক নারী ভোটারের। ঢাকার পল্টন এলাকার বাসিন্দা রিনা আক্তার ভোট দিতে যাওয়ার আগ্রহের পাশাপাশি সতর্কতার কথাও জানিয়েছেন।
তিনি মনে করছেন, শুধু ভোটকেন্দ্রে নয়, রাস্তাঘাটেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যাতে ভোটাররা নির্বিঘ্নে এবং নিশ্চিন্ত মনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।
রিনা আক্তার জানান, 'এবার অনেকদিন পর নির্বাচনের উৎসব টের পাচ্ছি। যে দলই আসুক নারীদের জন্য ভালো করুক। যাব ঠিকই ভোট দিতে— একটু ভয় কাজ করছে। ভোটকেন্দ্রে ও রাস্তায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা থাকলে নারীরা নিশ্চিন্তে ভোট দিতে যেতে পারবে।'
অন্যদিকে ঢাকার বাইরের নারী ভোটাররা জানান, সামাজিক চাপ ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের উপস্থিতিও নিরাপত্তা ভাবনার অংশ। নির্বাচনকে সামনে রেখে শহরের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন তারা। প্রশাসনিক তৎপরতা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আনাগোনার কারণে কিছুটা অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলে জানান তারা।
রংপুরের কর্মজীবী নারী ওয়াসিফা জাফর অদ্রি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'শহরে এখন পর্যন্ত কোনো গণ্ডগোল চোখে না পড়লেও কাল দুপুরের মধ্যে বড় একটা ঝামেলা লাগবে বলেই আমিসহ আশেপাশের অনেক মানুষের ধারণা হচ্ছে। আরও খেয়াল করছি, গণ্ডগোলে আটকে পড়ার ভয়ে মানুষের ভোট দিয়ে যাওয়া নিয়েও দ্বিধা তৈরী হচ্ছে। আসলে সবচেয়ে বড় বিষয়টা হচ্ছে, আমাদের জেনারেশন সবচেয়ে আনপ্রেডিক্টেবল ভোটটা দেখতে যাচ্ছে।'
নির্বাচিত সরকার নিয়ে নারীদের প্রত্যাশা
আসন্ন সরকার গঠনের প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও সমঅধিকার নিশ্চিত করার প্রত্যাশা জানিয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার নারী ভোটাররা। তাদের মতে, নীতিনির্ধারণে নারীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ আরও শক্তিশালী হবে।
রাজধানীর ওয়ারী এলাকায় কাজ করা ৫৬ বছর বয়সী গৃহকর্মী মর্জিনা নতুন সরকার নিয়ে তেমন আশাবাদী নন। দীর্ঘদিন ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে তার মধ্যে হতাশাই বেশি।
তিনি বলেন, 'ভোট দিলেও আমরা কিছু পাইনা। এতদিন ধইরা দেখলাম এইরকম। নির্বাচিত হইলে তারা তাদের নিজেদের লোকদের সব সুবিধা দেয়। আমরা যে ঘাম ফেলায়া পরিশ্রম করি আমাদের নির্বাচনের পরে তারা চিনেনা। ভোট দিলেও আমার আর কোনো আশা নাই। এইবার যদি পরিবর্তন হয় তাইলে তো ভালো।'
প্রথমবারের মতো ভোট দেওয়া নিয়ে উৎসাহিত রাজধানীর একটি স্বনামধন্য সুপারশপের সেলস ম্যানেজার সাজিয়া আফরিন সৃষ্টি। রাজনৈতিক পরিবর্তন ও নারীর অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে তার প্রত্যাশা স্পষ্ট।
সাজিয়া মনে করেন ভোটের মাধ্যমে নারীরা দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতে অংশ নিতে পারে এবং পরিবর্তনের সম্ভাবনা আনতে পারে।
তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস)- বলেন, 'এর আগে ভোট দিতে পারি নাই। এবার মনে হচ্ছে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী ভোট দিতে পারব। আমরা পুরনো দলগুলো নিয়ে ক্লান্ত। চাই নতুন কেউ আসুক। নারীদের জন্য কাজ করুক, নারীদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করুক। তাহলেই দেশের উন্নতি সম্ভব।'
নির্বাচনের সময় ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ন্যস্ত রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এর উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ তালেবুর রহমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস)- বলেন, 'সামগ্রিকভাবে ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন সেভাবেই আমাদের নিরাপত্তা পরিকল্পনা করা হয়েছে। নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবার ভোটাধিকার প্রয়োগের পরিবেশ আমরা নিশ্চিত করছি। এরপরেও যদি কোনো অভিযোগ আসে আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করব।'
