ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনে বাংলাদেশে প্রভাব বাড়াতে চায় চীন: রয়টার্সের প্রতিবেদন
২০২৪ সালে নয়াদিল্লির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বেড়েছে। চলতি সপ্তাহের নির্বাচনের পর এই প্রভাব আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনীতিক ও বিশ্লেষকরা। তবে তারা এ-ও বলছেন যে, এত বড় প্রতিবেশী হিসেবে ভারতকে পুরোপুরি পাশ কাটানো সম্ভব নয়।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে ভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচনে এগিয়ে থাকা দুটি দলের সঙ্গেই ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে খুব একটা উষ্ণ ছিল না, যা হাসিনার ২০০৯ সাল থেকে টানা ১৫ বছরের শাসনামলে দেখা গেছে। বর্তমানে তার দল আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ এবং তিনি নয়াদিল্লিতে স্ব-নির্বাসনে রয়েছেন।
এদিকে, চীন ঢাকায় তার বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। অতি সম্প্রতি তারা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কাছে একটি ড্রোন কারখানা তৈরির জন্য প্রতিরক্ষা চুক্তিও সই করেছে।
চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনকে প্রায়ই বাংলাদেশি রাজনীতিক, কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠক করতে দেখা যায়। দূতাবাসের ফেসবুক পোস্ট অনুযায়ী, তিনি শত কোটি ডলারের অবকাঠামো প্রকল্প এবং দুই দেশের মধ্যে অন্যান্য সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করছেন।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, 'বাংলাদেশের মানুষ মনে করে শেখ হাসিনার অপরাধের সঙ্গে ভারতও জড়িত।'
তিনি আরও বলেন, 'যে দেশ একজন সন্ত্রাসীকে আশ্রয় দিচ্ছে এবং তাকে আমাদের দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির সুযোগ দিচ্ছে, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি বা ব্যবসা করা মানুষ মেনে নেবে না।'
তবে তারেক রহমান নিজে কিছুটা নমনীয় সুরেই কথা বলেছেন। গত সপ্তাহে তিনি রয়টার্সকে বলেন, 'আমরা সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখতে চেষ্টা করব, তবে অবশ্যই আমার জনগণ এবং দেশের স্বার্থ রক্ষা করে।'
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক আরও খারাপ হয়েছে, বিশেষ করে ক্রিকেটের ক্ষেত্রে, যা দুই দেশেই জনপ্রিয়। বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগে হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর চাপে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) থেকে এক তারকা বাংলাদেশি বোলারকে বাদ দেওয়া হয়।
এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ঢাকা মার্চ-মে মাসে অনুষ্ঠিতব্য আইপিএল সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে। এছাড়া ফেব্রুয়ারি-মার্চে অনুষ্ঠেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় সরানোর অনুরোধ জানায়। কিন্তু আইসিসি সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করায় বাংলাদেশ টুর্নামেন্ট থেকে বাদ পড়ে।
দুই দেশ একে অপরের নাগরিকদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়াও সীমিত করেছে। হাসিনার পতনের পর থেকে ভারতীয় ও বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রকাশ্যে বৈঠক খুব একটা দেখা যায়নি। তবে ডিসেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকায় এসে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানান।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বারবার ভারতকে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানালেও তাতে সাড়া মেলেনি। গত বছরের শেষ দিকে ঢাকার একটি আদালত গণ-অভ্যুত্থান দমনে প্রাণঘাতী নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময় ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হন। যদিও হাসিনা হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
'ধীরে ধীরে প্রভাব বাড়াচ্ছে চীন'
নির্বাচনের আগে বিএনপি এবং তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী একে অপরের বিরুদ্ধে বিদেশি শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ তুলছে। জামায়াত বিএনপিকে ভারতের বেশি ঘনিষ্ঠ বলছে, আর বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে পাকিস্তানের ঐতিহাসিক সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করছে, যে দেশটি ভারতের পুরনো শত্রু।
নয়াদিল্লি এবং পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির সামরিক সদর দপ্তরের দিকে ইঙ্গিত করে সম্প্রতি এক জনসভায় বিএনপি নেতা তারেক রহমান বলেন, 'দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ।'
ভারতীয় কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করেছেন যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে থাকায় নয়াদিল্লিকে পরবর্তী সরকার যারাই গঠন করুক, তাদের সঙ্গেই কাজ করতে হবে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের বার্ষিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ৯৫ শতাংশই চীন থেকে আমদানি।
হাসিনা চলে যাওয়ার পর চীনা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। হাসিনার সময় আদানি গ্রুপসহ ভারতীয় কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে ব্যবসা সম্প্রসারিত করলেও এরপর আর নতুন কোনো চুক্তি হয়নি।
নয়াদিল্লির থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক প্রোগ্রেস-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো কনস্টান্টিনো জ্যাভিয়ার বলেন, 'ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সংকটের সুযোগ নিয়ে চীন প্রকাশ্যে এবং পর্দার আড়ালে ধীরে ধীরে তার প্রভাব বাড়াচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা কমে যাওয়া এবং ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধের সুযোগ নিয়েও চীন নিজেকে আরও বিশ্বাসযোগ্য এবং নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।'
বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন যেহেতু বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা দিচ্ছে এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতের মতো বাংলাদেশে অস্থিরতার সময় সাম্প্রদায়িক বিতর্কে জড়াচ্ছে না, তাই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের টমাস কিয়ান বলেন, 'যদি ঢাকা ও নয়াদিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে না পারে, তবে বাংলাদেশের পরবর্তী সরকারের জন্য বেইজিংয়ের দিকে পুরোপুরি ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যাবে।'
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হবে না
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হওয়ার মানে এই নয় যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, 'বাংলাদেশের চীন ও ভারত উভয়কেই প্রয়োজন এবং বিষয়টি বাস্তবসম্মত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক হয়তো ভালো হবে, কিন্তু ক্ষমতায় আসা কোনো দলই ভারতকে উপেক্ষা করার মতো অপরিণামদর্শী হবে না।'
তিন দিকে ভারত এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর দিয়ে ঘেরা বাংলাদেশ বাণিজ্য, ট্রানজিট এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে ভারতের স্থল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য ঢাকার সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক প্রয়োজন। হাসিনা বাংলাদেশে অবস্থানরত ভারতবিরোধী বিদ্রোহীদের দমনে সহায়তা করেছিলেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও দুই দেশের বার্ষিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রায় ১৩.৫ বিলিয়ন ডলারে স্থিতিশীল রয়েছে, যেখানে ভারতের রপ্তানিই বেশি। আদানি গ্রুপ সম্প্রতি বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়িয়েছে, যদিও ঢাকা হাসিনার আমলে করা উচ্চ শুল্কের সমালোচনা করেছে।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনে ভারত সহায়তা করলেও তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি, সীমান্তে হত্যা এবং হাসিনার অজনপ্রিয় শাসনকে ভারতের বৈধতা দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে।
জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ জেন-জি সমর্থিত দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ভারতের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
এনসিপি প্রধান নাহিদ ইসলাম রয়টার্সকে বলেন, 'এটি কেবল নির্বাচনী বুলি নয়। নয়াদিল্লির আধিপত্য তরুণদের মধ্যে গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে এবং এটি নির্বাচনের অন্যতম প্রধান ইস্যু।'
