চট্টগ্রাম বন্দর জনগণের সম্পদ ও সামরিক স্থাপনাও, কোনো গোপনীয় চুক্তি হতে পারে না: ফরহাদ মজহার
চট্টগ্রাম বন্দর কেবল একটি অর্থনৈতিক স্থাপনা নয়; এটি জনগণের সম্পদ এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সামরিক স্থাপনাও। ফলে এখানে কোনো প্রকার গোপনীয় চুক্তি হতে পারে না। বন্দরের বিষয়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত জনগণকে জানিয়ে গ্রহণ করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন কবি, প্রাবন্ধিক ও চিন্তক ফরহাদ মজহার।
শুক্রবার (০৬ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে 'বন্দর সুরক্ষা কমিটি' আয়োজিত 'চট্টগ্রাম বন্দর সুরক্ষা বনাম বন্দর অচলের রাজনীতি' শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব মন্তব্য করেন।
সভায় ফরহাদ মজহার বলেন, 'বন্দর ইস্যুকে শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকে দেখলে চলবে না। এটি সরাসরি সামরিক প্রশ্ন। জনগণের সম্পদের বিষয়ে চুক্তির ভার আমলাদের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। অবশ্যই এ বিষয়ে জনগণকে পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে। তাদের মত নিতে হবে।'
বন্দর সুরক্ষা কমিটির আহ্বায়ক ফরহাদ মজহারের সভাপতিত্বে এবং সদস্য সচিব মেজর (অব.) আহমেদ ফেরদৌসের সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য রাখেন সংগঠনের চট্টগ্রাম সমন্বয়ক সাংবাদিক সালেহ নোমান। এছাড়া লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন আরেক সমন্বয়ক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা মোহাম্মদ রোমেল। সভায় আরও বক্তব্য রাখেন বন্দর শ্রমিক নেতা হুমায়ুন কবির ও ইব্রাহিম খোকন, জুলাই যোদ্ধা তৌহিদুল ইসলাম এবং সাংবাদিক আব্দুল্লাহ তুহিন।
চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বৃহৎ টার্মিনাল নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'ডিপি ওয়ার্ল্ড'কে দেওয়ার প্রতিবাদে গত ৩১ জানুয়ারি থেকে বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত টানা ছয় দিন বন্দরজুড়ে কর্মবিরতি পালন করেন শ্রমিকরা।
শ্রমিকদের এই আন্দোলনের ফলে বন্দর অচল হওয়াকে বিদেশিদের সঙ্গে চুক্তির পক্ষে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করার আশঙ্কা প্রকাশ করেন ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, 'চুক্তি বাতিলের দাবিতে আন্দোলনের কারণে বন্দর অচল হয়েছে। এবার শ্রমিকদের দোষী করেই চুক্তির সপক্ষে যুক্তি দেওয়া হবে। এটি দ্বিমুখী তলোয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হবে। এখন দক্ষতা ও অদক্ষতার প্রশ্ন সামনে আনা হয়েছে। আমাদের প্রশ্ন হলো—আমরা কেন আমাদের শ্রমিকদের দক্ষ করে তুলতে পারছি না? বন্দরকে কেন পিছিয়ে রাখা হচ্ছে?'
চুক্তিটির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, 'আমরা জানি না দেশের সামরিক সংকট বা জরুরি অবস্থা জারি হলে তখন বন্দরের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। আমি শুরু থেকেই বলেছি, শুধু বন্দরের অর্থনৈতিক বিকাশের দিকে না তাকিয়ে রাষ্ট্র ও সামরিক নিরাপত্তার দিকেও নজর দিতে হবে। যে দিক থেকেই দেখি না কেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের হৃদপিণ্ডের মতো। এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছেই বঙ্গোপসাগর, যেখানে বর্তমানে ভারত ও আমেরিকার মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা চলছে। বন্দরকে সুরক্ষিত রাখতে না পারলে বিশ্ব সভায় আমাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।'
গণসার্বভৌমত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করে ফরহাদ মজহার বলেন, '৫ই আগস্টের পর ক্ষমতা জনগণের হাতে এসেছিল। কিন্তু আমরা সেটাকে আবার পুরনো ব্যবস্থার হাতেই তুলে দিয়েছি। এর প্রকৃত অর্থ বুঝতে না পারায় জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে এখন সরকার, সংসদ বা রাষ্ট্র চাইলেই জনগণের মতামত না নিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিদেশিদের কাছে ইজারা দিতে পারছে।'
মতবিনিময় সভায় চট্টগ্রাম বন্দর সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বন্দর চেয়ারম্যানের অপসারণ দাবি তুলে বলেন, 'বর্তমানে প্রতি টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডেলিংয়ে বন্দর পায় ১৬১ ডলার। যেখানে প্রকৃত ব্যয় মাত্র ৩০-৩৫ ডলার। কিন্তু ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বাড়তি মুনাফা পাইয়ে দেওয়ার জন্য এই ব্যয় বাড়িয়ে ৫৬ ডলার দেখানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিডা চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী ৬০০ কোটি টাকা কমিশন পাওয়ার লোভে এই চুক্তিটি সম্পাদন করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এমনকি চুক্তির রেট নেগোসিয়েশন কমিটিকেও স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছে। অথচ সেই কমিটিও চুক্তি না করার পক্ষে ছয়টি পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল, যা বন্দর চেয়ারম্যান উপেক্ষা করেছেন। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছিল ডিপি ওয়ার্ল্ড (বিশ্বের পঞ্চম শীর্ষ পোর্ট অপারেটর), কিন্তু চুক্তি হচ্ছে তাদের সিস্টার কনসার্ন 'ডিপি ওয়ার্ল্ড এফজেডই' নামে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। যারা প্রতি কনটেইনার আয়ের ৭ শতাংশ পাবে। বন্দর কর্তৃপক্ষ এই প্রতিষ্ঠানের বোর্ড অব ডিরেক্টরস সম্পর্কেও পরিষ্কার জানে না; সেখানে শুধু একজন বাংলাদেশি ও একজন ভারতীয় সদস্য আছেন।'
শ্রমিক নেতা ইব্রাহিম খোকন বলেন, '১৯৮৬ সালে বন্দরের অর্গানোগ্রামে আট হাজারেরও বেশি শ্রমিক ছিল। বর্তমানে তা কমিয়ে অর্ধেকের নিচে নামিয়ে আনা হয়েছে, যাতে বন্দরকে সহজে বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া যায়। ২০০৭ সালে এনসিটি চালু হলেও বন্দর কর্তৃপক্ষ সেখানে কোনো স্থায়ী পদ সৃষ্টি করেনি। এছাড়া কর্ণফুলী নদীতে কখনোই প্রকৃত ক্যাপিটাল ড্রেজিং হয়নি, কেবল লুটপাট হয়েছে। ফলে সেখানে ১০ মিটারের বেশি ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারে না। এদিকে লালদিয়ায় টার্মিনাল করার জন্য ডেনমার্কের কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেখানে জেটি করলে নদীর নাব্যতা আরও কমে যাবে। এছাড়া ১২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালটি মাত্র ২০০ কোটি টাকা জামানতের বিনিময়ে সৌদি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়া হয়েছে।'
