শস্য ভান্ডারে যুক্ত হলো দুটি হাইব্রিডসহ ৬ নতুন ধানের জাত
দেশের শস্য ভান্ডারে যুক্ত হলো দুটি হাইব্রিডসহ আরও ছয়টি নতুন ধানের জাত। আজ বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) কৃষি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৫তম সভায় বাংলাদশে ধান গবষেণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) উদ্ভাবিত নতুন ছয়টি উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত দেশজুড়ে চাষাবাদের জন্য অবমুক্ত করা হয়।
বাংলাদশে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি)- পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
উদ্ভাবিত জাতগুলোর মধ্যে একটি ভিটামিন-ই সমৃদ্ধ, ১টি লবণাক্ততা সহনশীল, একটি ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী, একটি হাওরাঞ্চলের উপযোগী ও ঠান্ডা সহনশীল এবং দুটি লজিং টলারেন্ট বা ঢলে পড়া প্রতিরোধী হাইব্রিড জাত রয়েছে। সর্বশেষ এ ৬টি জাতসহ ব্রি উদ্ভাবিত জাতের সংখ্যা দাড়ালো ১২৭টিতে।
নতুন উদ্ভাবিত ব্রি ধান১১৫ একটি ভিটামিন-ই এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ জাত। এটি বাংলাদেশের প্রথম উচ্চ ফলনশীল কালো চালের জাত, যা এন্থার কালচার পদ্ধতি ব্যাবহার করে উদ্ভাবন করা হয়। এ জাতের গড় ফলন হেক্টর প্রতি ৭.৪ টন এবং জীবনকাল ১৩৭-১৪২ দিন। পূর্ণ বয়স্ক গাছের গড় উচ্চতা ১০০ সেন্টিমিটার।
ধান লম্বা ও চিকন। ধান কালচে বাদামী রঙের এবং ধানের দানার রং কালো। ১০০০টি পুষ্ট ধানের ওজন প্রায় ১৭.৮ গ্রাম। এ ধানের অ্যামাইলোজ ২৩%। ধানের দানায় ভিটামিন ই এবং সায়ানিডিন-৩- গ্লুকোসাইডের (সি৩জি) পরিমাণ যথাক্রমে ১৪.৯৮ মিলিগ্রাম/কেজি এবং ২৯.১২ মিলিগ্রাম/কেজি। এছাড়াও ধানের দানায় প্রতি ১০০ গ্রামে ৫৩৬.৬১ µM AAE [মাইক্রোমোল অ্যাসকরবিক অ্যাসিড সমতুল্য] অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বিদ্যমান।
ব্রি ধান১১৬ বোরো মৌসুমের উচ্চ ফলনশীল একটি নাবী জাত। ব্রি ধান১১৬ জাতটি ব্রি ধান৯২ এর সমসাময়িক একটি দীর্ঘ জীবনকালের জাত। গড় জীবনকাল ১৫৪ দিন। এ জাতের চালের আকার আকৃতি মাঝারি চিকন এবং ব্রিধান৯২ এর চালের চেয়ে সরু। গাছ শক্ত এবং মজবুত বিধায় এ জাতটি সহজে হেলে পরে না। এর ডিগ পাতা খাড়া ও লম্বা বিধায় ধানের শীষ উপর থেকে দেখা যায়না। ধান পাকলেও এর পাতা সবুজ থাকে।
প্রস্তাবিত জাতের ফলন পরীক্ষায় দশটি অঞ্চলে ব্রি ধান৯২ এর চেয়ে প্রায় ১৩.৭৫% বেশি ফলন দিয়েছে। এ জাতের হেক্টরে গড় ফলন ৮.৫৯ টন। উপযুক্ত পরিবেশে সঠিক ব্যবস্থাপনা করলে এ জাতটি হেক্টরে ১০.৩৬ টন পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম। এর চাষাবাদ পদ্ধতি ব্রি ধান৯২ এর অনুরূপ বিধায় এটি বিকল্প হিসেবে আবাদ করা যাবে।
ব্রি ধান১১৭ বোরো মওসুমের স্বল্প জীবনকালীন লবণাক্ততা সহনশীল ও ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী জাত। এ জাতের গড় ফলন হেক্টর প্রতি ৮.৬ টন। তবে উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে এর ফলন হেক্টর প্রতি ৯.৯০ টন পর্যন্ত পাওয়া যায়। এ জাতের দানা মাঝারি মোটা এবং সোনালী বর্ণের। এ জাতের জীবনকাল ১২৯-১৩৫ দিন (গড় জীবনকাল ১২৯ দিন), যা বোরো মওসুমের জনপ্রিয় জাত ব্রি ধান২৮ এর সমান জীবনকাল। ধানের দানায় অ্যামাইলোজের পরিমাণ শতকরা ২৪.২ ভাগ এবং প্রোটিনের পরিমাণ শতকরা ৯.৩ ভাগ। ভাত ঝরঝরে।
জাতটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো লবণাক্ততা সহনশীলতা ছাড়াও ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী এবং আর্টিফিশিয়াল ইনোকুলেশনে উচ্চ মাত্রার ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী (স্কোর-০-৩) ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।
ব্রি ধান১১৮ জাতটি হাওড় অঞ্চলের উপযোগী ঠান্ডা সহনশীল ধানের জাত। এ জাতটি প্রজনন পর্যায়ে ঠান্ডা সহনশীল হওয়ায় হাওরে আকস্মিক বন্যায় আধাপাকা থকে পাকা পর্যায়ে ধান ডুবে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি এড়ানোর জন্য এ জাতটি আগাম বপন (২৫ অক্টোবর-১ নভেম্বর) করলেও ধান চিটা হবে না এবং কমপক্ষে ৬.০ টন/হে ফলন দিতে সক্ষম, তবে স্বাভাবিক সময়ে অর্থাৎ ১৫-২০ নভেম্বর বপনে ১৪৫ দিনে ৬.৯-৮.৫ টন/হে পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম।
এ ধানের চালের আকার আকৃতি মাঝারি মোটা। ভাত বঝরঝরে এবং সাদা। এ ধানের চালে অ্যামাইলোজের পরিমাণ শতকরা ২৮.৩ ভাগ। এছাড়া প্রোটিনের পরিমাণ শতকরা ৯.১ ভাগ। প্রস্তাবিত জাতের ফলন পরীক্ষায় দশটি অঞ্চলে ব্রি ধান২৮ এর চেয়ে প্রায় ২২.৮৩% বেশি ফলন দিয়েছে।
ব্রি হাইব্রিড ধান৯ লজিং টলারেন্ট বা ঢলে পড়া প্রতিরোধী এবং মাঝারী মাত্রায় লবণাক্ততা সহনশীল। এটি চারা থেকে পরিপক্ক অবস্থা পর্যন্ত ৪-৮ ডিএস/মি. মাত্রায় লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। এর দানার আকৃতি মাঝারী ও দানায় অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৩.৬%। এক হাজার দানার ওজন ২৫.৫ গ্রাম ও দানায় প্রোটিনের পরিমান ৯.৩%। জীবনকাল ১৪৫-১৪৭ দিন। কৃষকের মাঠে স্বাভাবিক অবস্থায় ফলন ৯.৫-১০.৫ টন/হে। উপকূলীয় অঞ্চলে ফলন ৬.৫-৭ টন/হে।
ব্রি হাইব্রিড ধান১০ লজিং টলারেন্ট বা ঢলে পড়া প্রতিরোধী। দানার আকৃতি চিকন ও দানায় অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৩.৫%। এক হাজার দানার ওজন ২৩.৭ গ্রাম ও দানায় প্রোটিনের পরিমান ৯.১%। জীবনকাল ১৪৫-১৪৭ দিন। কৃষকের মাঠে স্বাভাবিক অবস্থায় ফলন ৯.৭-১০.৭ টন/হে.।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ব্রির মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ খালেকুজ্জামানসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নতুন উদ্ভাবিত জাতগুলোসহ ব্রির ৩৯টি জাত রয়েছে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন বৈরি পরিবেশ সহনশীল।
প্রসঙ্গত, ব্রি উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে কৃষকের দৌঁড়গোড়ায় পৌঁছানোর ফলেই বর্তমানে বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়। যেখানে স্বাধীনতার আগে ১৯৭১ সালে মাথাপিছু জমির পরিমাণ ছিল ২০ শতাংশ, এখন তা ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। এ সময়ে লোকসংখ্যা আড়াই গুণ বেড়েছে কিন্তু খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৪ গুণ।
