মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে চট্টগ্রাম বন্দরে লাইটারেজ জাহাজের সংকট কিছুটা কমেছে
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপের পর চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে লাইটারেজ জাহাজের সংকট কিছুটা কমলেও বন্দরের জট এখনো কমেনি। প্রায় ৩৪ লাখ টনের বেশি পণ্য নিয়ে প্রায় ১০০টি মাদার ভেসেল এখনো পণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক আলটিমেটামের পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। ওই নির্দেশনায় আমদানিকারকদের পাঁচ দিনের মধ্যে পণ্যবোঝাই লাইটারেজ জাহাজ খালাসের নির্দেশ দেওয়া হয়। এর আগে এসব জাহাজের অনেকগুলোই দেশের বিভিন্ন নদী টার্মিনালে ২০ দিনের বেশি সময় ধরে আটকে ছিল।
১৯ থেকে ২৬ জানুয়ারির মধ্যে সরকারি একটি টাস্কফোর্স ২৭৮টি জাহাজে অভিযান চালায়। পরিদর্শনে দেখা যায়, ১৬টি জাহাজ ২০ দিনের বেশি সময় ধরে পণ্য বহন করে রেখেছে, ৭০টি জাহাজ ১০ দিনের বেশি সময় ধরে বিলম্বিত ছিল এবং ১৯২টি জাহাজ ১০ দিনের কম সময় অপেক্ষমাণ ছিল।
নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পর বন্দরে লাইটারেজ জাহাজের সরবরাহ ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। গত দুই দিনে বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি) যথাক্রমে ৮২টি ও ৯০টি লাইটারেজ জাহাজ সরবরাহ করেছে, ফলে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসের গতি কিছুটা বেড়েছে।
এর এক সপ্তাহ আগে পাঁচটি বড় আমদানিকারকের কারণে ২০ দিনের বেশি সময় ধরে ২০০টিরও বেশি লাইটারেজ জাহাজ আটকে থাকার অভিযোগ উঠেছিল। তবে ২৫ জানুয়ারি প্রকাশিত বিডব্লিউটিসিসির এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ২০ দিনের বেশি সময় ধরে ১০২টি লাইটারেজ জাহাজ আটকে রেখেছিল।
আমদানিকারকদের মধ্যে আকিজ গ্রুপ তালিকার শীর্ষে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০ থেকে ৪৮ দিন পর্যন্ত ২১টি লাইটারেজ জাহাজ আটকে রেখেছিল। এসএস ট্রেডিং ১৩টি জাহাজ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে, আর এন মোহাম্মদ গ্রুপ আটকে রেখেছিল ১০টি জাহাজ। এছাড়া টোটাল, আরবি ট্রেডিং, শাবনাম, নাবিল, নওয়াপাড়া, শেখ ব্রাদার্স ও সিটি কমিউনিটিজ—এই প্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যেকে দুই থেকে পাঁচটি করে লাইটারেজ জাহাজ ধরে রেখেছিল।
নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর মো. শফিউল বারী বলেন, আইন প্রয়োগমূলক অভিযান এবং ২০ দিনের বেশি সময় ধরে পণ্যবোঝাই জাহাজ আটকে রাখা আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে মামলা করার ঘোষণা দেওয়ার পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
তিনি টিবিএসকে বলেন, "অভিযান পরিচালনা ও মামলা করার ঘোষণা দেওয়ার পর অনেক আমদানিকারক দ্রুত পণ্য খালাস করে জাহাজ ছেড়ে দিয়েছেন। এতে লাইটারেজ জাহাজের সরবরাহ বেড়েছে এবং পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। ১৯ থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত বিডব্লিউটিসিসির মাধ্যমে মোট ৫৪৭টি লাইটারেজ জাহাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, ২০ দিনের বেশি সময় ধরে পণ্যবোঝাই জাহাজ আটকে রাখার অভিযোগে বর্তমানে দুই আমদানিকারকের বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ ধরনের আরও মামলা করা হবে বলেও জানান তিনি। তবে অভিযুক্ত আমদানিকারকদের নাম প্রকাশ করতে তিনি রাজি হননি।
এদিকে, সংকট কিছুটা কমলেও আবারও জট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিডব্লিউটিসিসির কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে অন্তত ২০টি গমবোঝাই মাদার ভেসেল চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে আসছে, যেগুলো আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পৌঁছাতে পারে।
বিডব্লিউটিসিসি কনভেনার কমিটির সদস্য পারভেজ আহমেদ বলেন, সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি। তিনি বলেন, "সোমবার ১১৪টি লাইটারেজ জাহাজের চাহিদা ছিল, কিন্তু আমরা বরাদ্দ দিতে পেরেছি মাত্র ৯০টি। এতে ২৪টি জাহাজের ঘাটতি থেকে গেছে।"
এদিকে বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে প্রায় ৩৪ দশমিক ৪ লাখ টন পণ্য নিয়ে ৯৮টি মাদার ভেসেল আটকে ছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব জাহাজে করে মোট ৪৫ দশমিক ৯ লাখ টন পণ্য এসেছে। এর মধ্যে মাত্র ১১ দশমিক ৪ লাখ টন পণ্য খালাস করা গেছে। ফলে এখনো বিপুল পরিমাণ পণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে।
জটের সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে রয়েছে খাদ্যশস্য। শুধু গমই রয়েছে ২৫টি জাহাজে ১০ দশমিক ৪ লাখ টনের বেশি। এ ছাড়া খালাসের অপেক্ষায় থাকা অন্যান্য খাদ্যপণ্যের মধ্যে রয়েছে সয়াবিন ৩ লাখ ৬২ হাজার ৯৮৬ টন, ভুট্টা ১ লাখ ৫৬ হাজার ৮০৪ টন, ডাল ৯৬ হাজার ২৭৪ টন, ছোলা ৩৪ হাজার ২৫২ টন এবং চিনি ২ লাখ ৩৮ হাজার ৪৫৫ টন।
শিল্প খাতের কাঁচামালও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আটকে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৩ লাখ ৯২ হাজার টনের বেশি ক্লিংকার, ১ লাখ ৭৮ হাজার ৫৫৬ টন লাইমস্টোন, ২ লাখ ৮১ হাজার ৩১২ টন স্ল্যাগ এবং ৩ লাখ ৪৭ হাজার ৯৫২ টন কয়লা।
পাশাপাশি ডিএপি, এমওপি, টিএসপি ও ইউরিয়াসহ সারজাতীয় পণ্যের খালাসবাকি কার্গোর পরিমাণ ১ লাখ ১৭ হাজার টনের বেশি।
বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সারওয়ার হোসেন সাগর বলেন, লাইটারেজ জাহাজের প্রাপ্যতা কিছুটা বেড়েছে, তবে তা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় কম।
তিনি বলেন, "যেসব ফ্যাক্টরি-এনলিস্টেড জাহাজ বর্তমানে কোনো কার্গো অপারেশনে নেই, সেগুলোকে বিডব্লিউটিসিসির বরাদ্দের আওতায় আনা গেলে সংকট আরও কমানো সম্ভব।"
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বাংলাদেশের সমুদ্রপথে বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি পণ্য পরিবহন হয়। ফলে এই বন্দরে জট তৈরি হলে তা সারাদেশে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় এবং স্থানীয় বাজারে এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে।
