অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত যশোর বিএনপি: তৃণমূলের অনৈক্যে আসন হারানোর শঙ্কা
নির্বাচন ঘনিয়ে এলেও যশোরের ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে পাঁচটিতেই মেটেনি বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল। এসব আসনে মনোনয়নপত্র বঞ্চিত প্রার্থীদের অনুসারীদের এখনো নির্বাচনী মাঠে নামাতে পারেননি চূড়ান্ত প্রার্থীরা। জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার কড়া নির্দেশনা থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ের বড় একটি অংশ তা মানছে না। তৃণমূল কর্মীদের আশঙ্কা, এই অভ্যন্তরীণ বিভক্তির সুযোগ নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। দ্রুত কোন্দল মেটাতে না পারলে আসনগুলো হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে বিএনপি।
যশোর-১ (শার্শা)
১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলেন চার হেভিওয়েট নেতা। প্রাথমিকভাবে মনোনয়ন পেয়েছিলেন সাবেক দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তি। পরে তার মনোনয়ন পরিবর্তন করে নুরুজ্জামান লিটনকে চূড়ান্ত প্রার্থী করা হয়। এতে তৃপ্তির অনুসারীরা ক্ষুব্ধ হয়ে মাঠ থেকে দূরে সরে আছেন। উপজেলা বিএনপির সভাপতি হাসান জহির ও সাবেক সভাপতি খায়রুজ্জামান মধুর অনুসারীদেরও প্রচারে দেখা যাচ্ছে না।
প্রার্থী নুরুজ্জামান লিটন বলেন, 'দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। প্রতীক নিয়ে কাজ করছি। অনেকের মধ্যে পাওয়া না পাওয়া নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। ঐক্যবদ্ধ না থাকলে বিরোধীরা তাদের শক্তি দেখাবে; এটাই স্বাভাবিক। তবে নেতাকর্মীরা ক্ষোভ ও দ্বিধা-বিভক্তি ভুলে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছি।'
মনোনয়ন বঞ্চিত হাসান জহির বলেন, 'নেতাকর্মীদের ক্ষোভ আছে সত্যি। যার যার অনুসারীদের মাঝে হতাশা রয়েছে। তবে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারি না।'
যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা)
এই আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন কেন্দ্রীয় সদস্য সাবেরা সুলতানা। এখানে মনোনয়ন বঞ্চিত চৌগাছা উপজেলার সাবেক সভাপতি জহুরুল ইসলাম স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও পরে সরে দাঁড়ান। তবে তিন দিন পার হলেও তাকে বা আরেক বঞ্চিত নেতা মিজানুর রহমান খানকে সাবেরা সুলতানার প্রচারে দেখা যায়নি। সাবেরা সুলতানা বলেন, 'যারা মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েছে তাদেরকে এখনোও প্রচার-প্রচারণাতে পাইনি। স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। ওনারা দ্রুতই আসবেন বলে আশা করছি।'
যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর)
এখানে কৃষকদলের টিএস আইয়ুবের মনোনয়ন বাতিল হওয়ার পর অভয়নগর বিএনপির সভাপতি মতিয়ার ফারাজীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু টিএস আইয়ুবের অনুসারীরা এখনো নীরব রয়েছেন। জেলা বিএনপি দুই উপজেলার নেতাদের নিয়ে মতবিনিময় করলেও এর সুফল এখনো মেলেনি।
যশোর-৫ (মণিরামপুর)
এই আসনে বিএনপির কোন্দল সবচেয়ে চরম পর্যায়ে। প্রাথমিক মনোনয়ন পাওয়া শহীদ মোহাম্মদ ইকবাল হোসেনকে বাদ দিয়ে জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের (একাংশ) মুফতি রশীদ বিন ওয়াক্কাসকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ইকবাল বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বর্তমানে আসনটিতে চরম দ্বিধা-বিভক্তি বিরাজ করছে।
মণিরামপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মিন্টু বলেন, 'আসনটিতে নেতাকর্মীরা দ্বিধা-বিভক্তিতে চরম। আমরা দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছি। আসনটিতে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় সুবিধা নিচ্ছে জামায়াতের প্রার্থী। ফলে আমরা আসন হারানোর শঙ্কায় রয়েছি।'
যশোর-৬ (কেশবপুর)
চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হোসেন আজাদ। এখানে মনোনয়ন বঞ্চিত ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ কিংবা অমলেন্দু দাস অপুর অনুসারীরা প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন না।
যশোরের ৫টি আসনে বিরোধ থাকলেও যশোর-৩ (সদর) আসনে বিএনপি সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ। এখানে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। কেন্দ্রীয় নেতা হওয়া এবং জনপ্রিয়তার কারণে অন্য কেউ এখানে মনোনয়ন চাননি। জেলা ও উপজেলা বিএনপিসহ সামাজিক অঙ্গনের প্রতিনিধিরাও অমিতের পক্ষে কাজ করছেন।
যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেরুল হক সাবু বলেন, 'ইউনিয়ন ও পৌরসভার সব ভোটারদের মধ্যে অমিতকে নিয়ে সাড়া ফেলেছে। কেননা তিনি বিগত সরকারের শত মামলা কাঁধে নিয়েও মাঠের রাজনীতি ছেড়ে যাননি। করোনারকালেও তিনি সাধারণ মানুষের পাশে ছিলেন। আবার তার প্রয়াত পিতা সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামকে যশোরের উন্নয়নের কারিগর বলা হয়। সেদিক দিয়েও অমিত জনগণের সাড়া পাচ্ছেন।'
অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রসঙ্গে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, 'মনোনয়ন পাওয়া না পাওয়া নিয়ে বিভেদের সৃষ্টি হয়। সেই বিভেদ কাটাতে আমরা দলীয় প্রার্থীসহ বঞ্চিত নেতা ও তাদের কর্মীদের নিয়ে মতবিনিময় শুরু করেছি। আশা করছি, দ্রুতই সকল নেতাকর্মী সকল ভেদাভেদ ভুলে দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করতে কাজ করবে। দলের বাইরে গেলে নেওয়া হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা।'
রাজনীতিকরা বলছেন, কোন্দল মিটিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে ভোট করলে সবকটি আসন বিএনপি পেতে পারে। সেক্ষেত্রে দলটির নীতি নির্ধারকদের ভূমিকা রাখতে হবে। আর যদি কোন্দল মেটাতে ব্যর্থ হয় তাহলে ৫টি আসনই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে মনে করছেন খোদ বিএনপির নেতরা।
