‘থ্রি জিরো’ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে কথা হলেও দেশে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেই: ইফতেখারুজ্জামান
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বন নিঃসরণ—এই থ্রি জিরো নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে কথা বলা হলেও দেশে এর বাস্তবায়নের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। আন্তর্জাতিক পরিচ্ছন্ন জ্বালানি দিবস পালনে সরকার সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) সকালে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত আন্তর্জাতিক ক্লিন এনার্জি দিবস উপলক্ষে মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, 'এই দিবসটি পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো সচেতনতা সৃষ্টি করা—বিশ্বব্যাপী সকল নাগরিককে, বিশেষ করে রাষ্ট্রক্ষমতার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সচেতন ও সক্রিয় করা। কিন্তু সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে অর্পিত যে সরকার—জনগণের ও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার—তার শীর্ষে অধিষ্ঠিত যে বিশ্বনন্দিত নেতা, যার অন্যতম মূল মন্ত্র 'থ্রি জিরো'। এই 'থ্রি জিরো' হলো—শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য এমিশন, অর্থাৎ শূন্য কার্বন নিঃসরণ।'
তিনি বলেন, 'এই তিনটি জিরোকে ধারণ করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের বাইরে প্রচারণা চালালেও, দেশে কি একবারও তিনি তা করেছেন? যদি করে থাকেন, তবে তার সরকারের আরও অনেকেই আছেন, যারা আমাদের সঙ্গে পথে নেমে পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে, এমিশনের বিরুদ্ধে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির পক্ষে আন্দোলন করেছেন—তারা কেন এই দিবসটির কথা একবারও উল্লেখ করলেন না? তারা বিষয়টি জানেন, অবহিত—তবু কেন তারা দেশবাসীকে তা জানাননি?'
জ্বালানি নীতির সমালোচনা করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, 'জ্বালানি নীতি পড়লে দেখা যায়—তার মূল তাত্ত্বিক ভিত্তি এখনও সম্পূর্ণভাবে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। সেখানে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে উত্তরণের কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। আমরা কোনো সরকারের কাছ থেকেই এটি আশা করি না এবং ভবিষ্যতের সরকারের কাছেও করব না। এটি বাংলাদেশের জাতীয় অস্তিত্বের বিষয়।'
তিনি আরও বলেন, 'যে মাস্টারপ্ল্যানটি ২০২৫ সালে ঘোষণা করা হয়েছে, সেটি এখনও অনুমোদিত হয়নি। সৌভাগ্যের বিষয়—যদি অনুমোদিতও হয়, আমরা সেটি প্রত্যাখ্যান করতাম। কারণ এই সরকারের কার্যক্রমের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল—অংশগ্রহণমূলক নয়, অস্বচ্ছতার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত চাপানো, নীতিমালা চাপানো এবং অর্ডিন্যান্স চাপানো। জ্বালানি মাস্টারপ্ল্যানও তারই একটি দৃষ্টান্ত; এটি স্টেকহোল্ডারদের সম্পৃক্ত না করে তৈরি করা হয়েছে।'
তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'পুরো বিষয়টি নতুন করে পুনঃপ্রণয়ন করতে হবে। সংশোধনের সময় এই সরকারের নেই। কিন্তু যারা ক্ষমতায় আসবেন, তাদের কাছে আমাদের আবেদন—আপনারা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে, অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ, টেকসই উন্নয়ন, জননিরাপত্তা এবং জাতীয় অস্তিত্ব বিবেচনায় নিয়ে অনতিবিলম্বে একটি কার্যকর কর্মপরিকল্পনা ও মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করুন। এমন একটি পরিকল্পনার মাধ্যমে বাস্তবে আমরা জিরো এমিশনের দিকে এগোতে পারব।'
তিনি আরও বলেন, 'সরকারের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। মেয়াদ শেষে তারা যেন নিজেরাই একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে। এই শ্বেতপত্রকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে যে আলোচনা ও প্রচারণা হবে, তার মধ্য দিয়ে 'থ্রি জিরো'কে কেন্দ্র করে সরকার কতটুকু দায়িত্ব পালন করেছে, তা দেশবাসী জানতে চাইবে। বিশেষ করে আজকের দিবসের মূল প্রতিপাদ্য—জিরো এমিশন, জিরো কার্বন নিঃসরণ, অর্থাৎ নবায়নযোগ্য ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের বিষয়ে সরকার কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।'
তিনি প্রশ্ন তোলেন, 'কোনো ভিত্তি তৈরি করার মতো উদ্যোগ তারা নিয়েছেন কি না, যাতে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারগুলো সেটিকে এগিয়ে নিতে পারে—সে সুযোগটি আমরা দেশবাসী কেন হারালাম? এই প্রশ্নের জবাব সরকারকে দিতে হবে। আমি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি বলব, তাদের অন্তত একটি প্রবন্ধ লিখে প্রকাশ করা উচিত, যেখানে তারা তুলে ধরবে এই তিনটি বিষয়ে তারা কী কী কাজ করেছে, বিশেষ করে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ক্ষেত্রে কী ভিত্তি স্থাপন করেছে। তারা যদি সৎ হয়, তাহলে লিখতে হবে—বাস্তবে তারা বিপরীত কাজই করেছেন।'
মানববন্ধনে জ্বালানি খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির রূপান্তরে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য টিআইবির পক্ষ থেকে ৯টি সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে—রাজনৈতিক দলগুলোর জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অগ্রাধিকার দেওয়া; নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫-সহ বিদ্যমান সকল নীতি ও পরিকল্পনায় অভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ প্রণয়ন; উৎপাদন, সরবরাহ ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বিনিয়োগ কাঠামো উন্নয়ন।
অন্যান্য সুপারিশের মধ্যে রয়েছে—জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য পরিবেশ ছাড়পত্র প্রদান এবং দূষণ ও পরিবেশ-বিষয়ক তদারকিতে স্বচ্ছ ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ; আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক এবং দেশীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পাদিত জ্বালানি খাতের সকল প্রকল্প প্রস্তাব এবং চুক্তির নথি প্রকাশ; এনডিসির অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে বাতিল হওয়া কয়লা ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণকৃত জমিতে সোলারসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়ন; শিল্প ও আবাসিক গ্রাহকদের নেট মিটারিং সৌর বিদ্যুৎ স্থাপন সহজীকরণ; ফিড-ইন-ট্যারিফ কার্যকর এবং তাদের উদ্বুদ্ধ করতে প্রণোদনা দেওয়া; নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার প্রদান এবং স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্ত থেকে প্রকল্প অনুমোদন ও চুক্তি সম্পাদন; এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
মানববন্ধনে সংহতি জানিয়ে ওয়াটার কিপার্স বাংলাদেশ, কর্মজীবী নারী, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি), একশন এইড বাংলাদেশ, মিডিয়া রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই), বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
