গণভোট জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন, দলীয় বা ব্যক্তিগত স্বার্থ দেখলে চলবে না: রিজওয়ানা হাসান
গণভোট জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন, এখানে দলীয় বা ব্যক্তিগত স্বার্থ দেখলে চলবে না বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
তিনি বলেন, ''জাতীয় স্বার্থে যদি আপনি 'হ্যাঁ' বলেন, আপনি কোন দলকে পছন্দ করেন আর না করেন; দেশ কিন্তু জিতে যাবে। যদি দেশ জিতে যায়, আমরা সকলে জিতে যাব। আমরা এমন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত চাই না, যেখানে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়। আমরা এমন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত চাই না, যেখানে জনগণ মুখোমুখি হয়ে উত্তর দেওয়ার সাহস থাকবে না, সদুত্তর দেওয়ার সাহস থাকবে না। কাজেই আমরা ব্যক্তি বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে, দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে, দেশের স্বার্থে গণভোটকে 'হ্যাঁ' বলব।''
আজ মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) ঢাকার সাভারের রেডিও কলোনি এলাকায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক আয়োজিত প্রচারণামূলক কার্যক্রম 'ভোটের রিকশা'র উদ্বোধন শেষে উদ্বোধক হিসেবে দেওয়া বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
এসময় তিনি বলেন, ''নির্বাচন, সংস্কার, বিচার—এই তিনটাই হচ্ছে আমাদের মোটা দাগের প্রধান কাজ। আমরা নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। ১২ই ফেব্রুয়ারি, ইনশাআল্লাহ, দেশের সাধারণ নির্বাচন এবং গণভোট—দুইটা একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে। সাধারণ নির্বাচনে যাবেন আপনারা। আপনারা কাকে ভোট দেবেন—সম্পূর্ণ আপনাদের বিষয়।''
তিনি আরও বলেন, ''রাজনৈতিক দলগুলো আপনাদের কাছে তাদের বার্তা নিয়ে যাবে। তাদের কাছ থেকে যাদেরকে আপনাদের পছন্দ, আপনারা তাদেরকেই বেছে নেবেন। আমাদের শুধু একটা আবেদন থাকবে—এমনভাবে নিজের নেতা বেছে নেবেন, যাতে করে এক মাস, দুই মাস, তিন মাসের মধ্যে আর বলতে না হয়, এটা কি করলাম। যাতে আর পস্তাতে না হয়। আমরা যদি বলি আমাদের নেতারা ভালো না, তাহলে আমাদের কিন্তু মানতে হবে—আমরাও ঠিকভাবে নেতা নির্বাচন করতে পারি নাই।''
এসময় ভোটারদের প্রতি দেশ ও সমাজের স্বার্থ বিবেচনা করে সাধারণ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সংস্কার প্রস্তাবগুলো সরকার লিখে নাই উল্লেখ করে উপদেষ্টা এসময় বলেন, ''সরকার যে ১১টি কমিশন করেছে, সেই ১১টি কমিশনের মধ্যে ছয়টি কমিশন, যার সাথে নির্বাচনের ক্ষমতার ভারসাম্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সেই কয়েকটি কমিশনের সুপারিশগুলো নিয়ে আপনারা দেখেছেন, মাসের পর মাস আলোচনা করা হয়েছে দেশের সকল প্রধান রাজনৈতিক দলের সঙ্গে। সেই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে জুলাই সনদ প্রস্তুত করা হয়েছে।'
তিনি বলেন, ''সেই জুলাই সনদে ৩০টা দলের মধ্যে কোন ২৮টা দল কোন একটাতে 'হ্যাঁ' বলেছে। ২৯টা দল কোন একটাতে 'হ্যাঁ' বলেছে, দুইটা দল কোন একটাতে 'না' বলেছে। কিন্তু জুলাই সনদে প্রায় সবাই স্বাক্ষর করেছে। এই স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ থেকে মোটা দাগে যেটা আমরা মনে করেছি—রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ক্ষমতার ভারসাম্যের ক্ষেত্রে, জনগণ ক্ষমতায়িত করার ক্ষেত্রে, সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে, বিচার ব্যবস্থাকে স্বাধীন করার ক্ষেত্রে, নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে—সেগুলোর একটা প্রশ্নমালা করে গণভোটে দেওয়া হয়েছে।''
এসময় সবাইকে গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোটে সিল দেওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি 'হ্যাঁ' ভোটে সিল দেওয়ার আহ্বান জানানোর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উপদেষ্টা বলেন, ''আমরা মনে করি যে 'হ্যাঁ' ভোটে সিল দিলে সংস্কারগুলো যখন হবে, তখন দেশের জনগণ প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করতে পারবে।''
এসময় গণভোটে একটা পৃথকভাবে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সুযোগ না রাখা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ''বাংলাদেশের অনেক সাধারণ মানুষ আছে, যারা এই প্রশ্নগুলো সবকটা পড়ে তারা 'হ্যাঁ' বা 'না' বলতে পারবে না। ফলে একটা প্রশ্ন একটা পুরো কাঠামোর মধ্যে আমরা এগুলো বারবার তাদেরকে বুঝাচ্ছি।''
এসময় কোন দলের পক্ষে ভোট দেওয়ার সময় সেই দলের সবকিছু পছন্দ হয় কি না—সেই উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ''আপনি যখন একটা দলের পক্ষে ভোট দেন, ওই দলের সবকিছু কি আপনার পছন্দ হয়? তাও তো আপনি ওই দলকেই ভোট দেন। তার হয়তো ৮০ ভাগ আপনার পছন্দ হয়, ২০ ভাগ হয় না। এটাও সেরকম—সব প্রস্তাবকে একটা সার্বিকভাবে ইতিবাচক ধরে নিয়ে আমাদেরকে 'হ্যাঁ' বা 'না' বলতে হবে।''
২০১১ সালে বিচার বিভাগের কাঁধে বন্দুক রেখে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে সংবিধান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে উপদেষ্টা এসময় বলেন, ''১৯৯০ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার হলো। তারপরে ১৯৯৬ সালে বিস্তর আন্দোলনের পরে আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার হলো। এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার কেন হলো? যাতে করে সব নির্বাচন সুষ্ঠু হয় এবং জনমত সত্যিকার অর্থে প্রতিফলিত হয়। কিন্তু ২০১১ সালে বিচার বিভাগের কাঁধে বন্দুক রেখে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থাকে সংবিধান থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো। যদি আপনি 'হ্যাঁ' ভোট দেন, আর বিচার বিভাগের কাঁধে বন্দুক রাখা যাবে না। যদি আপনি 'হ্যাঁ' ভোট দেন, তাহলে এইভাবে আর সংবিধান সংশোধন করা যাবে না। দেশের চার মিনিটে সংবিধান সংশোধিত হয়েছে, চার মিনিটে আইন প্রণীত হয়েছে। এটা তো আমরা চাই না। আমরা চাই জনগণ জানুক যে আমরা তাদের পক্ষ হয়ে কী কাজটা করছি।''
এছাড়াও 'হ্যাঁ' ভোট দিলে সরকার প্রশাসনে একা একা লোক নিয়োগ করতে পারবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ''এই যে আমরা বলি—প্রশাসনে অমুক সচিব আমার লোক, তমুক সচিব অমুকের লোক—এটা তো হওয়ার কথা না। প্রশাসনে দলের লোক থাকবে কেন? প্রশাসনে জনগণের লোক থাকবে। আমি কেন প্রশাসনে এই দলের লোক খুঁজব, প্রশাসনে ওই দলের লোক খুঁজব? আর এই যে একটা প্রতিহিংসার বিভাজন—এইখান থেকে উত্তোলনের পথ কিন্তু বেশ কঠিন আমাদের জন্য।''
তিনি আরও বলেন, ''যদি আমরা এখানে 'হ্যাঁ' ভোট দিই, তাহলে প্রশাসনের লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার একা একা বসে বসে লোক নিয়োগ করতে পারবে না। ওইখানে বিরোধী দলেরও একটা ভূমিকা থাকবে। ডেপুটি স্পিকার হবে বিরোধী দল থেকে। তাহলে নিজের ইচ্ছামতন সংসদে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজের পছন্দমত লোককে দিয়ে গান গাওয়ানো যাবে না। ব্যক্তি পূজার জায়গা বন্ধ হবে।''
রিজওয়ানা হাসান বলেন, ''সংসদ তো একটা প্রতিষ্ঠান। ওখানে গান গাওয়ার জন্য, ব্যক্তি পূজা করে গান গাওয়ার জন্য তো আমরা কাউকে সংসদে পাঠাব না। সংসদ প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হলে বিরোধী দলকেও ক্ষমতা নিতে হবে। সেই ক্ষমতাটা এখানে আপনারা দিয়ে দেবেন, যদি আপনারা 'হ্যাঁ' বলেন।''
এছাড়াও 'হ্যাঁ' ভোট দিলে জনগণের সাংবিধানিক অধিকারগুলো আরও বিস্তৃত হবে উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, ''যদি আপনি 'হ্যাঁ' ভোট দেন, তাহলে পরিবেশের অধিকারটা অধিকার হিসেবে আসবে। আপনার সবসময় ইন্টারনেট সেবা পাওয়ার অধিকার—এটাও আপনার অধিকার হিসেবে আসবে। তার মানে সাংবিধানিক অধিকারগুলো আরও অনেক বেশি বিস্তৃত হবে। জনগণের অধিকার বিস্তৃত হওয়া মানে সরকারের কাজ, সরকারের দায়িত্ব বেড়ে যাওয়া।'
তিনি বলেন, ''এই যে সংবিধান পরিবর্তন—৩০০ জনে মিলে, তার মধ্যে ২০০ সিট পেলেই তো সংবিধান পরিবর্তন করে ফেলা যায়। সেজন্য এই ৩০০ জনের উপরে আরেকটা উচ্চকক্ষ থাকবে। এখন সেটা ভোটের ভিত্তিতে হবে না আসনের ভিত্তিতে হবে, ওটা পরবর্তীতে রাজনৈতিক দলগুলো ঠিক করবেন। তখন কিন্তু উচ্চকক্ষ থেকেও আপনার সম্মতি নিতে হবে। চার মিনিটে আইন, চার মিনিটে সংবিধান আর করা যাবে না।''
উপদেষ্টা বলেন, ''আজকে এমন কিছু প্রজন্ম আছে, যেই প্রজন্মে কেউ কেউ হয়তো এই প্রথমবার ভোট দেবে। অনেকেই ভোট দেবে না। ভোট দেওয়াটা কেবল একটা অধিকার না, এটা একটা দায়িত্ব। আপনার ভুল সিদ্ধান্তে গোটা দেশ পস্তাতে পারে। আর আপনার সঠিক সিদ্ধান্তে, ব্যক্তিগত সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে আপনি যখন সিদ্ধান্ত নেবেন, সেই সিদ্ধান্তে দেশ উপকৃত হবে।''
তিনি বলেন, "একটা কথা মনে করাই আজকে—যার বয়স ৩৮, সে হয়তো জীবনে কোনোদিন ভোটই দেয় নাই। কারণ ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪-এ এবং ২০০৯-এর পর থেকে এমন প্রহসনের সব নির্বাচন হয়েছে যে এমনকি স্থানীয় সরকারেও হয়তো মানুষ ভোট দেয় নাই।''
তিনি আরও বলেন, ''তাহলে আপনি ভাবতে পারেন—যেখানে আপনার ১৮ বছরে ভোটাধিকার প্রয়োগের কথা, আপনার ৩৮ বছর হয়ে গেছে, আপনি এখনো পর্যন্ত কোনো ভোটই দিতে পারেন নাই। কারণ এমনই এক তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আমরা ছিলাম—ওরা নিজেরা নিজেরাই নিজেদেরকে জয়ী ঘোষণা করত। সেই দিনের আমাদেরকে অবসান ঘটাতে হবে।''
এসময় 'ভোটের রিকশা' প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ''বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে ভোটের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য, মানুষকে ভোটদানে উৎসাহিত করার জন্য আমরা প্রতিটি ইউনিয়নে একটা করে ভোটের রিকশার ব্যবস্থা করেছি। এই ভোটের রিকশাগুলোতে মাইকিং হবে। সেখানে জনগণকে সাধারণ নির্বাচন ও গণভোটে একই সঙ্গে নির্ভয়ে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করার আহ্বান জানানো হবে।''
তিনি আরও বলেন, ''সরকারের পক্ষ থেকে গণভোটে জনগণ যেন পরিবর্তনের স্বপক্ষে থেকে 'হ্যাঁ' ভোট দেয়, সেই আহ্বান এবং জনগণ 'হ্যাঁ' ভোট দিলে কী কী জিনিস তারা পাবে, রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতার ভারসাম্যে, জনগণের ক্ষমতায়নে, মানুষের অধিকারের বিস্তৃতি ঘটানোর ক্ষেত্রে কোন কোন পরিবর্তন আসবে—তাদেরকে সেগুলো বোঝানো হবে।''
