প্রতি মুহূর্তেই মানসিকভাবে খেই হারিয়ে ফেলছিলাম: গুম হওয়া পরিবারের আর্তনাদে তারেক রহমান
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম ও খুনের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের মুখে তাদের অসহনীয় দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। 'আমরা বিএনপি পরিবার' এবং 'মায়ের ডাক'-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনরা উপস্থিত হয়ে তাদের স্মৃতিচারণ করেন।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দীর্ঘ প্রতীক্ষা, অনিশ্চয়তা ও শোকের বর্ণনা শুনে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
গুম হওয়া পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যের প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, 'আপনারা যখন আপনাদের কষ্টের কথাগুলো তুলে ধরছিলেন, তখন প্রতি মুহূর্তেই আমি মানসিকভাবে খেই হারিয়ে ফেলছিলাম। আমাকেও বাধ্য হয়ে বহু বছর দেশ, স্বজন ও দেশের মানুষ থেকে দূরে থাকতে হয়েছে।'
গুম ও খুনের বিভীষিকাময় দিনগুলোর অবসান হয়েছে উল্লেখ করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, 'বাংলাদেশ এখন গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে শুরু করেছে। যারা স্বজন হারিয়েছেন, যেসব মা-বোনেরা তাদের সন্তান বা স্বামীকে হারিয়েছেন, তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা আমাদের নেই। এক দুঃসহ সময় আমরা অতিক্রম করেছি। অনেক সন্তান এখনো অপেক্ষায় আছেন যে গুম বা হারিয়ে যাওয়া পিতা হয়তো হঠাৎ করে তাদের দরজায় এসে কড়া নাড়বেন। অনেক মা হয়তো এখনো অপেক্ষায় আছেন, তার গুম হয়ে যাওয়া প্রিয় সন্তানটি হঠাৎ করেই মায়ের সামনে এসে হাজির হয়ে "মা" বলে ডাকবেন।'
দলের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'দলীয়ভাবে আমরা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে সক্রিয় থাকতে এবং প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তুলতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। ঠিক একইভাবে আমাদের সাধ্য ও সামর্থ্য দিয়ে স্বজনহারা মানুষগুলোর পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। কতটুকু পেরেছি আর কতটুকু পারিনি, সেটির জবাব ভিন্ন। তবে এতটুকু বলতে পারি, আমাদের আন্তরিকতায় কোনো ঘাটতি ছিল না। হয়তো সীমাবদ্ধতা ছিল, এখনো আছে। কিন্তু আমাদের এই চেষ্টা ভবিষ্যতে অব্যাহত থাকবে।'
এসময় কৌশলের নামে বিএনপি গুপ্ত কিংবা সুপ্ত বেশ ধারণ করেনি বলে মন্তব্য করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, 'কৌশলের নামে গুপ্ত কিংবা সুপ্ত বেশ ধারণ করেনি বিএনপি। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যে দলের কর্মীরা অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে আপসহীন ভূমিকা রাখতে পারে, সেই দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কিংবা অপপ্রচার চালিয়ে দমন করা যাবে না।'
তারেক রহমান বলেন, 'ফ্যাসিবাদী আমলের নির্যাতনের শিকার আমার সামনে বসা হাজারো প্রিয় মুখ, আপনাদের যে আত্মত্যাগ, আপনাদের বুকভরা কষ্ট—আমরা যারা আজ পেছনে রয়ে গিয়েছি, আমরা আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করব যাতে এটি বৃথা না যায়। ইনশাআল্লাহ।'
তিনি বলেন, 'ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে যারা গুম হয়েছেন, যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের প্রতি আগামী দিনের গণতান্ত্রিক যে রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা আমরা দেখছি, সেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং সরকারের অবশ্যই অনেক অনেক দায় এবং দায়িত্ব রয়েছে। রাষ্ট্র কখনোই আপনাদেরকে ভুলে যেতে পারে না।'
সকল শহীদদের আত্মত্যাগ-কে জনমনে স্মরণীয় করে রাখতে আগামী দিনে বিএনপি কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে তারেক বলেন, 'যদিও নির্বাচন কমিশনের বাধ্যবাধকতার কারণে এই মুহূর্তে আমি হয়তো বিস্তারিতভাবে সেই পরিকল্পনা আজকের এই অনুষ্ঠানে তুলে ধরতে পারছি না। কিন্তু তারপরেও বলতে যদিও কষ্ট হচ্ছে যে, আমরা দেখেছি নির্বাচন কমিশনের রিসেন্টলি (সম্প্রতি) কিছু বিতর্কিত ভূমিকা বা বিতর্কিত অবস্থান। তারপরেও রাজনৈতিক একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা ধৈর্যের পরিচয় দিতে চাই।'
তিনি বলেন, 'তবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে গণতান্ত্রিককামী মানুষ যেন এই শহীদদের বা এই গুম হয়ে যাওয়া সদস্য—এখনো যাদের অপেক্ষায় আমরা আছি, এখনো যাদের অপেক্ষায় পরিবাররা রয়েছে—সেই শহীদদের আত্মত্যাগ থেকে প্রেরণা লাভ করতে পারে।'
এসময় বিএনপি জনগণের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে পারলে আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনা তাদের নামে নামকরণ করার ঘোষণা দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, 'যেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই শহীদদের ত্যাগের কথা গৌরবের সঙ্গে স্মরণ করতে পারে।'
শহীদদের সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়ার অঙ্গীকার করে তারেক রহমান বলেন, 'আগামীর বাংলাদেশে শহীদদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে তাদের নাম অঙ্কিত হবে, যাতে তাদের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে।'
তারেক রহমান বলেন, 'বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দেড় লক্ষেরও বেশি মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছিল, যার বোঝা বইতে হয়েছে প্রায় ৬০ লক্ষ নেতাকর্মীকে। বছরের পর বছর লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মী ঘরবাড়ি ও স্বজনদের ছেড়ে মানবেতর জীবন কাটিয়েছেন। এসব মামলাই ছিল রাজনৈতিক।'
আন্দোলনে নেতাকর্মীদের ত্যাগের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, 'দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শত নির্যাতন, গুম ও খুনের পরও বিএনপির একজন নেতাকর্মীও রাজপথ ছাড়েনি। এক ভাই গুম হওয়ার পর অন্য ভাই দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে রাজপথে দাঁড়িয়েছে।'
