ইন্টারনেট বন্ধ করে গণহত্যা: জয় ও পলকের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আবেদন প্রসিকিউশনের
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে ইন্টারনেট বন্ধ করে গণহারে হত্যার উস্কানির অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আবেদন করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।
রোববার (১১ জানুয়ারি) বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই আবেদন করা হয় এবং এর ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
প্রসিকিউশনের শুনানির পর আসামিপক্ষের অভিযোগ থেকে অব্যাহতির আবেদনের শুনানির জন্য আগামী বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। এদিন প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ও কৌঁসুলি গাজী এম এইচ তামিম। অন্যদিকে পলকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী লিটন আহমেদ এবং জয়ের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্র নিয়োজিত আইনজীবী মনজুর আলম মনজু।
এর আগে ট্রাইব্যুনাল গত বছরের ৪ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের জমা দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন এবং ১০ ডিসেম্বর জয়কে আত্মসমর্পণের জন্য দুটি জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে ও তার আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ইন্টারনেট বন্ধ করে বিশ্বের কাছ থেকে গণহত্যার তথ্য লুকানোর চেষ্টা করেছিলেন। এ ঘটনার 'মাস্টারমাইন্ড' বলা হচ্ছে জয়কে এবং পলকের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অভিযোগ আনা হয়েছে।
শুনানি শেষে কৌঁসুলি গাজী এম এইচ তামিম বলেন, 'আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি মামলায় চার্জ গঠনের ওপর প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে শুনানি সম্পন্ন হয়েছে। এই মামলায় দুইজন আসামি। একজন হলেন সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয় এবং আরেকজন হলেন জুনাইদ আহমেদ পলক। সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয় জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি উপদেষ্টা ছিলেন এবং জুনাইদ আহমেদ পলক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তৎকালীন সরকারের দায়িত্ব পালন করেছেন।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা চার্জ গঠনের শুনানিতে বলেছি যে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে সরকার পরিকল্পিতভাবে ইন্টারনেট সেবা প্রথমে স্লো করে দিয়ে এবং পরবর্তীতে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিয়ে এই আন্দোলনে যারা ছাত্র-জনতা নিরীহ-নিরস্ত্রভাবে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছিল, তাদের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধ পরিচালনা করেছে। সেই তথ্য দেশে এবং দেশের বাইরে যেন মানুষ জানতে না পারে, সেই জন্য পরিকল্পিতভাবে ইন্টারনেট বন্ধ করেছে।'
প্রসিকিউটর তামিম বলেন, 'আন্দোলনকারীরা যেন পরস্পর যোগাযোগ করতে না পারে, সেজন্য এই ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছে। এর প্রমাণ হিসেবে আমরা এই আসামিদের নিজস্ব কথোপকথন ট্রাইব্যুনালে জমা দিয়েছি; যেটি সরকারি প্রতিষ্ঠান এনটিএমসি কর্তৃক রেকর্ড করা হয়েছিল। যেটি তৎকালীন সরকার রেকর্ড করতেন তাদের প্রয়োজনে, কিন্তু আজকে তাদের রেকর্ড করা ডকুমেন্ট আমরা হাতে পেয়েছি এবং ট্রাইব্যুনালে জমা দিয়েছি।'
কথোপকথনের বরাত দিয়ে তামিম বলেন, 'পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে যে, জুনাইদ আহমেদ পলক তৎকালীন একজন প্রভাবশালী অ্যাডভাইজারের সাথে মোবাইল ফোনে কথোপকথন করছেন। কথোপকথনে বলছেন যে, আটটি অ্যাপস অর্থাৎ অ্যাপ্লিকেশনস চিহ্নিত করা হয়েছে, যেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যবহৃত করা হয় এবং ৮টি বন্ধ করে দেওয়ার ডিসিশন হয়েছে। এবং এই ব্যাপারে উনারা আইসিটি অ্যাডভাইজার অর্থাৎ এই মামলার অন্যতম আসামি সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয় সাহেবের সাথে কথা বলেছেন।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'এই কথোপকথন থেকেই দেখা যায় যে, উনারা পরিকল্পিতভাবে বন্ধ করেছিলেন। তার পরেও আমরা তদন্তকালে এমন কিছু সরকারি নথি-উপাত্ত পেয়েছি, যাতে পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে যে- তারা এই সময়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাছাই করে যে, কোন কোন অ্যাপস বন্ধ করলে তাদের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ থাকবে, মানুষ এগুলা জানতে পারবে না, সেগুলো পরিকল্পিতভাবে ৮টি অ্যাপস তারা বন্ধ করেছিল। অতএব, আমরা ট্রাইব্যুনালে আশা করছি যে, এটি ট্রাইব্যুনালকে আমরা বোঝাতে সক্ষম হয়েছি যে, এই আসামিদের সম্পৃক্ততায়, ষড়যন্ত্রে এবং পরিকল্পনায় ইন্টারনেট বন্ধ হয়েছে।'
