প্রথম আলোর কার্যালয়ে হামলা: গ্রেপ্তার ১৫ জন কারাগারে
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর কার্যালয়ে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় তেজগাঁও থানায় করা মামলায় গ্রেপ্তার ১৫ জনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
সোমবার (২২ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানার আদালত এই আদেশ দেন।
কারাগারে যাওয়া আসামিরা হলেন- মো. নাইম ইসলাম (২৫), মো. সাগর ইসলাম (৩৭), মো. আহাদ শেখ (২০), মো. বিপ্লব (২০), মো. নজরুল ইসলাম ওরফে মিনহাজ (২০), মো. জাহাঙ্গীর (২৮), মো. সোহেল মিয়া (২৫), মো. হাসান (২২) ও মো. রাসেল (২৬)।
এছাড়া মো. আব্দুল বারেক শেখ ওরফে আলামিন (৩১), মো. রাশেদুল ইসলাম (২৫), মো. সাইদুর রহমান (২৫), আবুল কাশেম (৩৩), মো. প্রাপ্ত সিকদার (২১) ও মো. রাজু আহমেদ (৩৩)।
এর আগে, আসামিদের আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তেজগাঁও থানার পুলিশ পরিদর্শক আবদুল হান্নান।
আটক রাখার আবেদনে বলা হয়, তদন্তকালে এলাকার বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজন ও বিশ্বন্ত সোর্সদের কাছে জিজ্ঞাসাবাদে ও সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে একাধিক জায়গায় অভিযান পরিচালনা করে এই আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার এক নম্বর আসামি মো. নাইম ইসলামের (২৫) কাছ থেকে লুটের নগদ ৫০ হাজার টাকা এবং লুটের টাকায় কেনা ১টি ফ্রিজ এবং ১টি এলইডিটিভি জব্দ করা হয়েছে। মামলার তদন্ত অব্যাহত আছে এবং আসামিদের নাম-ঠিকানা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াধীন। এ অবস্থায় মামলার তদন্ত সমাপ্ত ও আসামিদের বর্ণিত ঠিকানা যাচাই-বাছাই না হওয়া পর্যন্ত তাদের জেল হাজতে আটক রাখা প্রয়োজন। মামলার সুষ্ঠ তদন্তের স্বার্থে তদন্তকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত গ্রেপ্তার আসামিদের জেলহাজতে আটক রাখা একান্ত প্রয়োজন।
এদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী হাবিবুর রহমান, হোসেন আহামাদ ও ইমদাদুল্লাহ মোল্লাহ তাদের জামিন চেয়ে শুনানি করেন৷
শুনানিতে তারা বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে এই মামলায় কোন উপদান নেই। আসামিদের মধ্যে কেউও দিনমজুর, গার্মেন্টস কর্মী, রিক্সাচালক। আসামিদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। অনেক আসামি তাদের বাসা থেকে ঘুমন্ত অবস্থায় গ্রেপ্তার করে পুলিশ। যারা গ্রেপ্তার হয়েছেন তাদের কাউকে সিসি ফুটেজ বা ফেসবুকের ভিডিওতে দেখা যায়নি। আসামি নাইম ইসলাম নিজের টাকায় ফ্রিজ ও টিভি কিনেছেন। আগুন লাগার কারণে নগদ টাকা পয়সা থাকার কথা না। আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন। যে শর্তে তাদের জামিনের প্রার্থনা করছি।
এরপর রাষ্ট্রপক্ষে মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী এর বিরোধিতা করে শুনানিতে বলেন, 'আসামিদের বিরুদ্ধে মামলায় যে ধারাগুলো আনা হয়েছে তা জামিন অযোগ্য।'
তিনি বলেন, 'ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদিকে হত্যার ঘটনায় কেন্দ্র করে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে তারা হামলা চালায়। এর ফলে হাদির ঘটনাটি ধামাচাপা পড়ে যায়, তারা সেই ব্যবস্থা করেছে।'
তিনি আরও বলেন, 'তারা বাংলাদেশের প্রথম সারির দুটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে আগুন দিয়ে ভাঙচুর করেছে। এছাড়াও এখন পর্যন্ত জানামতে প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩২ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি করেছে তারা।'
পাবলিক প্রসিকিউটর বলেন, 'বিভিন্ন ফেসবুক পেজের লাইভ ও ধারণকৃত মিডিয়ার ভিডিও ফুটেজে তাদের ঘটনাস্থলে দেখা গেছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সেই ভিডিও ফুটেজ দেখে তাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করেন। মামলার তদন্ত স্বার্থে আসামিদের জেলহাজতে আটক রাখার প্রার্থনা করছি।'
এসয়ম কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আসামিরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন।
তারা বলেন, 'আমাদের কোনো অপরাধ নেই, আমাদের নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলবে। আমরা নির্দোষ স্যার।'
উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত তাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়, গত ১৮ ডিসেম্বর রাত সোয়া ১১টার দিকে ২০ থেকে ৩০ জন অজ্ঞাত দুষ্কৃতকারী দেশীয় অস্ত্র, লাঠিসোঁটা, দাহ্য পদার্থ নিয়ে মিছিল করে কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে এসে হামলার চেষ্টা চালায়।
পুলিশ বাধা দিলে তারা বেআইনিভাবে প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে সমবেত হয়ে উত্তেজনা সৃষ্টিকারী স্লোগান দেয়। বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে তারা লোক জড়ো করে। প্রথম আলোতে হামলার জন্য উসকানিমূলক পোস্ট দিতে থাকে। ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে ৪০০ থেকে ৫০০ জন দুষ্কৃতকারী প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়।
আরও বলা হয়, রাত ১১টা ৫০ মিনিটের দিকে তারা প্রথম আলো কার্যালয়ের ফটকের কাচ ও শাটার ভেঙে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। তারা ভবনের সামনের কাচ ভেঙে আসবাব, মালপত্র, নথিপত্র নিচে ফেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। বিভিন্ন তলার দেড়শো' কম্পিউটার, ল্যাপটপ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, লকারে রাখা টাকা, প্রথমা প্রকাশনের বইপত্র লুট করে নিয়ে যায় দুষ্কৃতকারীরা।
তারা ভবনের অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা নষ্ট করে ফেলে। সাক্ষ্য প্রমাণ নষ্ট করতে সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে ফেলে। তারা ফায়ার সার্ভিসকেও আগুন নেভানোর কাজে বাধা দেয়। হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের সময় শুধু লুটপাট করা সম্পদের মূল্য ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৩২ কোটি টাকা বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
ওই ঘটনায় প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠানের হেড সিকিউরিটি অফিসার মেজর (অব.) মো. সাজ্জাদুল কবির বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।
