ঢাকা-মাওয়া-ভাঙা এক্সপ্রেসওয়েতে অতিরিক্ত গতি, দুর্ঘটনায় বেড়েই চলেছে প্রাণহানি

ঢাকা-মাওয়া-ভাঙা এক্সপ্রেসওয়েতে দুর্ঘটনা আর প্রাণহানি থামার যেন কোনো লক্ষণ নেই। গত ২১ আগস্ট ভোর ৬টার দিকে শ্রীনগর উপজেলার ষোলঘর যাত্রীছাউনির কাছে একটি প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে গেলে ঘটনাস্থলেই এক নারীসহ তিনজন নিহত ও একজন আহত হন।
একই দিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে শ্রীনগর থেকে নিমতলাগামী এক্সপ্রেসওয়েতে চার আরোহীসহ একটি মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে গেলে ঐ মুহূর্তে বিপরীত দিক থেকে আসা দ্রুতগতির একটি প্রাইভেটকার তাদের চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই দুজন মারা যান এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও একজনের মৃত্যু হয়।
এই দুটি ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং চলমান এক ভয়ংকর প্রবণতার অংশ। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কটি দিন দিন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে।
শুধু আগস্ট মাসেই গতকাল পর্যন্ত এই এক্সপ্রেসওয়েতে কমপক্ষে ১৩টি দুর্ঘটনায় ১০ জন নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছেন।
শ্রীনগর ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১লা জুলাই পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর থেকে ২১টি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলায় প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত এই সড়কে ১ হাজার ৩০৩টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এই তিন বছরে প্রাণ হারিয়েছেন ১৮৩ জন, আহত হয়েছেন প্রায় ২ হাজার মানুষ।
চলতি বছরের জুন মাস ছিল এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভয়াবহ। ওই মাসে ২৪টি দুর্ঘটনায় ১৭ জন মারা যান এবং ৫৪ জন আহত হন।
শ্রীনগর ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের তথ্যমতে, দুর্ঘটনার বেশিরভাগই ঘটছে পেছন দিক থেকে দ্রুতগতির যানবাহন সামনে থাকা গাড়িকে ধাক্কা দেওয়ার কারণে।
স্টেশন কর্মকর্তা মো. দেওয়ান আজাদ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'ঢাকা-মাওয়া-ভাঙা এক্সপ্রেসওয়েতে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার পর্যালোচনায় দেখা যায়, বেশিরভাগ দুর্ঘটনাই দ্রুতগতির গাড়ি সামনে থাকা গাড়িকে পেছন থেকে ধাক্কা দিলে ঘটেছে।'
'যদিও কোনো গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়, এরপরও পেছন থেকে আসা যানবাহনের ধাক্কায় প্রাণহানি বেড়ে যায়। তাই নির্ধারিত গতিসীমা মানতে চালকদের কঠোরভাবে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা এখন জরুরি।'
তিনি আরও জানান, এ মহাসড়কে দুর্ঘটনার পেছনে প্রায় ২৫টি কারণ রয়েছে। যেমন: দ্রুতগতি, চালকদের প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা, অসতর্কতা, ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি, যাত্রীদের চাপ, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ঘাটতি, পর্যাপ্ত স্ট্রিটলাইটের অভাব, ঘন কুয়াশায় ফগলাইট ব্যবহার না করা, প্রতিকূল আবহাওয়ায় জরুরি বাতি না জ্বালানো এবং ট্রাফিক আইন না মানা।
শিবচর হাইওয়ে থানার ওসি জাহিরুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, 'বেশিরভাগ দুর্ঘটনাই ঘটছে দ্রুতগতির কারণে। আমরা স্পিড গান দিয়ে আমাদের এলাকায় বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছি, তবে তা যথেষ্ট নয়।'
'প্রতি মাসে ৩৫০ থেকে ৪০০ মামালা করা হয় দ্রুতগতির কারণে। যদি স্পিড শনাক্তকারী যন্ত্র ও জনবল বাড়ানো যায়, তবে এক্সপ্রেসওয়ের যানবাহনগুলোকে আরও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।'
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নির্দেশনায় প্রাইভেটকার, বাস ও মিনিবাসের জন্য সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার, মোটরসাইকেলের জন্য ৬০ কিলোমিটার এবং ট্রাকের জন্য ৫০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা আছে। বিধি লঙ্ঘন করলে তিন মাসের জেল অথবা ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে বাস্তবে তা মানছেন না বেশিরভাগ চালক।
গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) রোড সেফটি কর্মসূচির কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর ড. শরিফুল আলম টিবিএসকে বলেন, 'গতিসীমা নির্ধারণের নিয়ম থাকলেও তা বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে না। এক-দুই জায়গায় স্পিড গান দিয়ে মনিটরিং এবং সামান্য জরিমানা দিয়ে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়।'
'প্রয়োজন এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন স্থানে ক্যামেরা বসিয়ে গাড়ির গতি রেকর্ড করা এবং আইন ভঙ্গকারীদের শনাক্ত করে রেজিস্ট্রেশন নম্বরের মাধ্যমে দায়বদ্ধ করা। এর ফলে ১০ দিন পরও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।'
তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তিকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো দরকার।
'বিআরটিএ চাইলে যানবাহনের ইঞ্জিনে এমন ব্যবস্থা চালু করতে পারে, যাতে নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ি বন্ধ হয়ে যায়। এ ধরনের প্রযুক্তি অনেক দেশে চালু আছে। একই সঙ্গে নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন সরকারিভাবে অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করাও জরুরি।'