ট্রেজারি বিল-বন্ডে ব্যক্তি বিনিয়োগ কমেছে, বেড়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের ট্রেজারি বিল ও বন্ডে ব্যক্তিপর্যায়ের বিনিয়োগ তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো কমেছে। তবে ব্যাংক, বিমা কোম্পানি ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ বাড়ায় সরকারি সিকিউরিটিজে সামগ্রিক বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে ব্যক্তিপর্যায়ের বিনিয়োগ ৪৫০ কোটি টাকা কমে ৭ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছর শেষে এর পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট সরকারি সিকিউরিটিজের মাত্র শূন্য দশমিক ৯৪ শতাংশ ছিল ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের হাতে।
ব্যক্তিপর্যায়ের বিনিয়োগ কমার এ প্রবণতা আগের দুই অর্থবছরের চিত্রের বিপরীত। ২০২৩ সালের জুনে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে ব্যক্তিপর্যায়ের বিনিয়োগ ছিল মাত্র ১ হাজার ১০২ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালের জুনে বেড়ে ৩ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
ব্যাংকাররা বলছেন, ব্যক্তি পর্যায়ের বিনিয়োগকারীরা মূলত ট্রেজারি বিলেই বেশি বিনিয়োগ করেন। ট্রেজারি বিল স্বল্পমেয়াদি সরকারি সিকিউরিটিজ, যার মেয়াদ তিন মাস থেকে এক বছরের কম। ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদের হার বাড়তে শুরু করলে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি বিশেষ করে ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগও বাড়তে থাকে।
তবে ব্যাংকের তুলনায় ব্যক্তি পর্যায়ের বিনিয়োগকারীরা ট্রেজারি বিল ও বন্ডে অনেক কম বিনিয়োগ করেন। ব্যাংকারদের মতে, সরকারি বিল-বন্ড সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা কম। এ ছাড়া আমানত রাখার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের আস্থা ব্যাংকের ওপরই বেশি।
২০২৩ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণের ৯ শতাংশ সুদসীমা তুলে দিয়ে স্মার্ট (SMART) ভিত্তিক সুদহার ব্যবস্থা চালু করে। এরপর থেকেই মূলত ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদের হার বাড়তে থাকে।
সুদের হার বাড়তে বাড়তে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে একপর্যায়ে ১২ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। ব্যাংকাররা বলছেন, এর আগে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে ব্যক্তি পর্যায়ের বিনিয়োগ কখনো এত বেশি ছিল না।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের বিভিন্ন মাসের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদের হার কোনো কোনো মাসে প্রায় ১২ শতাংশের কাছাকাছি ছিল, আবার কোনো কোনো মাসে ১২ শতাংশ ছাড়িয়েছিল। ওই সময়ে ব্যাংকভেদে আমানতের সুদের হার ছিল ৯ থেকে ১১ শতাংশ।
তবে চলতি বছরের আগস্টে শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলো আমানতের সুদের হার ৫০ থেকে ১০০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত কমিয়েছে। কোনো কোনো ব্যাংক ১০০ বেসিস পয়েন্টেরও বেশি কমিয়েছে। এতে এসব ব্যাংকে আমানতের সুদের হার কমে সাড়ে ৮ থেকে ৯ শতাংশে নেমে এসেছে।
পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, "২০২৫-২৬ অর্থবছরে অনেক ব্যাংক আমানতে সাড়ে ১০ থেকে ১১ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিয়েছে। ফলে ব্যক্তি পর্যায়ের বিনিয়োগকারীরা আবার ব্যাংকে টাকা রেখেছেন। তারা স্বল্প সময়ে বেশি মুনাফার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বিনিয়োগ করেন।"
তিনি বলেন, "অনেক ব্যাংকে তিন মাসের জন্য আমানত রাখলেও সে সময় ১০ শতাংশ সুদ পাওয়া গেছে। কিন্তু ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ করে তখন সেই হারে সুদ পাওয়া যাচ্ছিল না।"
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯১ দিনের ট্রেজারি বিলের সুদের হার ছিল প্রায় ১০ দশমিক ৫২ শতাংশ, যা আগের দুই অর্থবছর ও অন্যান্য সময়ের তুলনায় অনেক কম।
প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ বেড়েছে
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৯৫ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৯৩ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা।
ব্যাংকাররা বলছেন, ট্রেজারি বিল ও বন্ডে মূলত ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি বিনিয়োগ করছে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকেই বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কম রয়েছে।
এ ছাড়া মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত টানা চার মাস বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে ছিল। ফলে ব্যাংকগুলো এখন বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে ট্রেজারি বিল ও বন্ডকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।
