সবুজ কারখানা গড়েও বাড়তি দাম পাচ্ছেন না পোশাক রপ্তানিকারকরা
গত এক দশকে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ক্ষত কাটিয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজের ভাবমূর্তি ফেরাতে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করে বিশ্বের বৃহত্তম পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানার হাব গড়ে তুলেছে বাংলাদেশ। বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি লিড সার্টিফাইড কারখানার মধ্যে ৫২টিই বাংলাদেশে। তবে উদ্যোক্তারা দেখছেন, এই 'সবুজ' স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের বাড়তি দাম পাওয়ার ক্ষেত্রে তেমন কোনো ভূমিকা রাখছে না।
একটি লিড সার্টিফাইড বা পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানা নির্মাণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। শিল্প সংশ্লিষ্টদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, কারখানার আকার ও মানভেদে এমন একটি আধুনিক কারখানা গড়তে ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন। সাধারণ কারখানার তুলনায় এর নির্মাণ খরচ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি। এই বাড়তি অর্থ মূলত ব্যয় হয় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ভবন নকশা, পানি পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যবস্থা, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আধুনিক ভেন্টিলেশন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের পেছনে।
বাংলাদেশি পোশাক প্রস্তুতকারকদের প্রত্যাশা ছিল, এই বিশাল বিনিয়োগ ক্রেতাদের আস্থা বাড়াবে এবং বিশ্ববাজারে তারা প্রতিযোগিতামূলক ও ভালো দাম পাবেন। তবে সেই প্রত্যাশা এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে।
স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, 'লিড বর্তমানে বাণিজ্যিক সুবিধার চেয়ে একটি 'মার্কেটিং গিমিক' বা বিপণন কৌশলে পরিণত হয়েছে। একটি কারখানা কেবল লিড সার্টিফাইড বলেই ক্রেতারা এক পয়সাও বাড়তি দাম দিতে রাজি হয় না। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের তুলনায় আমরাই লিড সনদকে অনেক বেশি বাণিজ্যিক গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছি।'
বর্তমানে বাংলাদেশে মোট ২৮৪টি লিড সার্টিফাইড পোশাক কারখানা রয়েছে, যার মধ্যে ১২১টি প্ল্যাটিনাম এবং ১৪৪টি গোল্ড রেটেড। এই বিশাল অর্জন রানা প্লাজা দুর্ঘটনা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের পোশাক খাতের ওপর বিশ্ববাসীর আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং দেশকে টেকসই উৎপাদনের বিশ্বনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ভাবমূর্তি ফিরলেও আসেনি 'প্রিমিয়াম' দাম
অনেক উদ্যোক্তার কাছেই 'সবুজ' বা পরিবেশবান্ধব হওয়ার লক্ষ্যটি কেবল তাৎক্ষণিক আর্থিক মুনাফা ছিল না। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-র সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, রানা প্লাজার পর শিল্পের প্রথম উদ্দেশ্য ছিল ক্ষতিগ্রস্ত ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনা এবং আমাদের কারখানাগুলো যে বিশ্বমানের তা প্রমাণ করা। সেই লক্ষ্য অনেকাংশেই অর্জিত হয়েছে।
তবে বাণিজ্যিক দিক থেকে চিত্রটি ভিন্ন। ফজলুল হকের মতে, পরিবেশবান্ধব কারখানার কারণে বড় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর কাছে পৌঁছানো সহজ হয়েছে এবং ক্রেতাদের সাথে সম্পর্কের পরিধি বেড়েছে। কিন্তু কারখানা নির্মাণে যে বিপুল পরিমাণ বাড়তি বিনিয়োগ হয়েছে, তা পুষিয়ে নিতে ব্র্যান্ডগুলো কোনো বাড়তি দাম বা আর্থিক প্রণোদনা দিচ্ছে না।
তিনি বলেন, 'আমাদের সুযোগ বেড়েছে, কিন্তু আর্থিক প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ক্রেতারা অর্গানিক কটনের মতো পণ্যের জন্য সানন্দে বাড়তি দাম দিলেও পরিবেশবান্ধব কারখানার মালিকদের ক্ষেত্রে তেমন কোনো স্বীকৃতি বা প্রিমিয়াম দিচ্ছে না। এটি ছিল মূলত উদ্যোক্তাদের নিজস্ব উদ্যোগ, ক্রেতারা আমাদের গ্রিন ফ্যাক্টরি করতে বাধ্য করেনি।'
বিনিয়োগের সুফল কেবল পণ্যের দামে নয়
তবে সবাই কেবল পণ্যের বাড়তি দাম দিয়ে লিড সনদের মূল্যায়ন করার পক্ষে নন। বিজিএমইএ-র সাবেক পরিচালক এবং বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, উদ্যোক্তাদের উচিত বিদ্যুৎ, পানি এবং পরিচালন ব্যয়ের দীর্ঘমেয়াদী সাশ্রয় দিয়ে এই বিনিয়োগের সার্থকতা বিচার করা।
তিনি বলেন, লিড সার্টিফাইড কারখানাগুলো সম্পদের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করে এবং এমন কর্মপরিবেশ তৈরি করে যেখানে তাপের চাপ কম থাকে। তিনি যোগ করেন, 'লিড নেওয়া একটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত। কোনো ক্রেতা কাউকে এটি নিতে বাধ্য করে না। যদি জ্বালানি ও পানির সাশ্রয় এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বিনিয়োগ উঠে আসে, তবেই একজন প্রস্তুতকারকের জন্য এটি লাভজনক হবে।'
ক্রেতাদের নজর এখন লিড সনদের বাইরে
কিছু কারখানা মালিকের মতে, বৈশ্বিক টেকসই উৎপাদনের আলোচনা এখন কেবল পরিবেশবান্ধব ভবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শোভন ইসলাম জানান, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন সনদের চেয়ে নিয়মিতভাবে যাচাইযোগ্য পারফরম্যান্স বা কর্মক্ষমতার ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন।
তিনি 'হিগ ইনডেক্স'-এর উদাহরণ টেনে বলেন, ক্রেতারা এখন জ্বালানি ব্যবহার, পানি সাশ্রয় এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্বাধীন ও প্রকৃত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সরবরাহকারীদের মূল্যায়ন করেন। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন আইন অনুযায়ী সাপ্লাই চেইনের স্বচ্ছতা এবং টেকসই উৎপাদনের প্রমাণের গুরুত্ব বাড়ছে।
শোভন ইসলাম বলেন, 'লিড সনদ এখন আর ক্রেতাদের আবশ্যিক শর্ত নয়। আজ ক্রেতারা যাচাইকৃত তথ্য চান। তারা দেখতে চান আপনি কতটা বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহার করছেন এবং আপনার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেমন। ইন্ডাস্ট্রি এখন সেদিকেই যাচ্ছে।' তার মতে, ইয়াংওয়ান-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো লিড সনদ ছাড়াও বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী সুনাম বজায় রেখেছে, কারণ তাদের কাজের গুণগত মানই মূল পরিচয়।
দেশে পরিবেশবান্ধব কারখানার সংখ্যা ক্রমাগত বাড়লেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি ১.৬৪ শতাংশ কমে ৩৮.৭০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি নেওয়ার এই সময়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
