রেজিন ও পলিয়েস্টার ফাইবার উৎপাদনকারীদের সুরক্ষা দিতে শুল্ক বৃদ্ধি: প্লাস্টিক ও টেক্সটাইল উদ্যোক্তাদের ব্যয় বাড়ার শঙ্কা
দেশীয় উৎপাদনকারীদের সুরক্ষা দিতে বাজেটে সরকার বেশ কিছু কাঁচামালের আমদানি শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। তবে এসব কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ পদক্ষেপের ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, আর এর ভার শেষপর্যন্ত ভোক্তার উপরই পড়বে।
প্রস্তাবিত অর্থবিল অনুযায়ী, বাজেটে পিভিসি রেজিন ও পিইটি রেজিনের আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। অন্যদিকে পলিয়েস্টার স্টেপল ফাইবারের আমদানি শুল্ক ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
পিভিসি রেজিন হলো প্লাস্টিক ও রাবার তৈরিতে ব্যবহৃত বহুমুখী ও সাশ্রয়ী একধরনের সাদা গুঁড়া। আর পিইটি রেজিন হলো একটি স্বচ্ছ, হালকা ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য থার্মোপ্লাস্টিক পলিমার, যা মূলত পানীয় ও খাদ্যপণ্যের বোতল ও কনটেইনার, নিত্যপণ্যের প্যাকেজিং ও সিনথেটিক ফাইবার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
পাইপ, পানির ট্যাংক, প্যাকেজিং সামগ্রী, স্বাস্থ্যসেবা পণ্য, ইলেকট্রনিকস, অটোমোবাইল, পানীয়ের বোতল ও ওষুধের প্যাকেজিংয়ের জন্য এই দুটি উপাদানই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল।
খাতসংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডাররা বলছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর সক্ষমতা স্থানীয় উৎপাদনকারীদের নেই। এছাড়া তারা আমদানিকৃত বিকল্প পণ্যের তুলনায় তারা অনেক সময় বেশি দামও নিয়ে থাকে।
প্লাস্টিক খাতের উদ্যোক্তাদের তথ্যমতে, দেশে পিভিসি রেজিনের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৫ লাখ টন ও পিইটি রেজিনের চাহিদা প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টন। কিন্তু স্থানীয়ভাবে এগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা যথাক্রমে ১.৫ লাখ টন ও ১ লাখ টন। ফলে চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশই আমদানির ওপর নির্ভরশীল থেকে যায়।
প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারকরা বলছেন, শুল্ক বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত তাদের উৎপাদন ব্যয় সরাসরি বাড়িয়ে দেবে।
ন্যাশনাল পলিমার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ বলেন, স্থানীয় রেজিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কিনলে এমনিতেই খরচ বেশি পড়ে। আবার মোট চাহিদার মাত্র ২৭ শতাংশ সরবরাহ করার সক্ষমতা রয়েছে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর।
'ফলে বাড়তি দামে আমদানি করতে হবে। এতে আমাদের তৈরি করা পণ্যের দাম বাড়বে, চাহিদা কমবে,' বলেন তিনি।
রিয়াদ আরও বলেন, এই নীতির ফলে হাতেগোনা কয়েকটি বড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সুবিধা পাবে, যা একচেটিয়া বাজার সৃষ্টি করতে পারে।
টেক্সটাইল খাতে উদ্বেগ
পলিয়েস্টার স্টেপল ফাইবারের ওপর শুল্ক বৃদ্ধির কারণে বস্ত্র খাতের প্রস্তুতকারকদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের রপ্তানি আয়ের প্রায় ২৫ শতাংশই আসে ম্যান-মেইড ফাইবার-ভিত্তিক পণ্য থেকে। অন্যদিকে বৈশ্বিক পোশাক বাজারের প্রায় ৭০ শতাংশই এই ধরনের ফাইবারের তৈরি পোশাকের দখল। ফলে বড় সম্ভাবনার কারণে স্কয়ার টেক্সটাইলস, নোমান গ্রুপ, হা-মীম গ্রুপ, কুমিল্লা স্পিনিং ও এনজেড গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এ খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, স্থানীয়া পলিয়েস্টার স্টেপল ফাইবার উৎপাদনকারীরা মোট চাহিদার মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মেটাতে পারে। আবার আমদানিকৃত পণ্যের তুলনায় তাদের পণ্যের দামও বেশি।
টেক্সটাইল মিল মালিকরা বলছেন, শুল্ক বৃদ্ধির কারণে ম্যান-মেইড ফাইবারনির্ভর প্রায় ৪০টি কারখানার ইয়ার্ন, ব্লেন্ডেড ইয়ার্ন ও ফ্যাব্রিক উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাবে।
এনজেড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালেহুদ্দিন জামান খান বলেন, এই পদক্ষেপ উৎপাদনকারীদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
তিনি বলেন, 'একজন স্থানীয় উৎপাদনকারী পলিয়েস্টার স্টেপল ফাইবার তৈরি করেন, কিন্তু এর সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অনেক কম। আবার দামও বেশি। ফলে আমাদের কাঁচামাল সংগ্রহের খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি এবং আমাদের ইয়ার্ন উৎপাদনের খরচও বেড়ে যাবে।'
সালেহুদ্দিন বলেন, 'আগে পলিয়েস্টার স্টেপল ফাইবার দিয়ে প্রতি কেজি ইয়ার্ন উৎপাদনে খরচ পড়ত ৩ ডলার, এখন তা বেড়ে ৩.১৫ ডলার হয়ে যাবে। ফলে আমরা ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাব। ভারত সরকার সেখানকার বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়ার কারণে তারা এমনিতেই আমাদের চেয়ে ০.২০ ডলার বাড়তি সুবিধা পায়।'
তিনি আরও বলেন, 'আমাদের শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনকারী শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার বিপক্ষে আমরা নই। সরকার আমাদের উপর করের ভার না চাপিয়ে বরং তাদেরকে ভর্তুকি, কম খরচের ফান্ড বা অন্যভাবে প্রণোদনা দিতে পার।'
শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা এ আশঙ্কাও করছেন যে, এই নীতি বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানিকে আরও উৎসাহিত করতে পারে। যেহেতু রপ্তানিকারকদের বন্ড লাইসেন্সের আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ রয়েছে, ফলে ইয়ার্ন ও ফ্যাব্রিক আমদানি আরো বেড়ে গিয়ে বরং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
সুবিধা পাবে কারা?
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুল্ক বাড়ানোর কারণে মূলত লাভবান হবে মেঘনা গ্রুপ ও টিকে গ্রুপ।
দেশে পিভিসি ও পিইটি রেজিন দুটিই উৎপাদন করে মেঘনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান মেঘনা পিভিসি লিমিটেড। আমদানি শুল্ক বাড়ার কারণে দেশের বাজারে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।
তবে স্থানীয় সরবরাহ অপর্যাপ্ত—এমন দাবির সঙ্গে একমত নন মেঘনা গ্রুপের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর বি এম ইসলাম।
তিনি টিবিএসকে বলেন, 'পিভিসি রেজিনে প্রায় ৬৪ শতাংশ এবং পিইটি রেজিনের প্রায় শতভাগ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে আমাদের। চাহিদা বাড়লে পুরোটাই সাপ্লাই দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব হবে।'
পলিয়েস্টার স্টেপল ফাইবারের বাজারে টিকে গ্রুপের মডার্ন পলি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও মডার্ন সিনটেক্স' প্রধান দেশীয় উৎপাদনকারী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কোম্পানিটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, তাদের বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা স্থানীয় চাহিদার প্রায় ৪৮ শতাংশ।
তিনি বলেন, '৫ শতাংশ শুল্ক খুব বেশি সুরক্ষা নয়। দেশে ইন্ডাস্ট্রি হতে হলে এই সুরক্ষা দিতে হবে। নইলে সারাজীবন আমাদের আমদানির ওপরই নির্ভর করতে হবে।'
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে যাবে, তখন স্থানীয় মূল্যের সংযোজনের ক্ষেত্রে আরও কঠোর শর্তের মুখোমুখি হতে হবে। সেই সময়ে শক্তিশালী স্থানীয় কাঁচামাল শিল্প থাকাটা অপরিহার্য হবে।
তবে টেক্সটাইল মিল মালিকরা বলছেন, পরবর্তী ধাপের উৎপাদনকারীদের খরচ বেড়ে গেলে তা শেষপর্যন্ত স্থানীয় উৎপাদনকে নিরুৎসাহিত করতে পারে এবং আমদানিরনির্ভরতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
