বিনিয়োগকারীদের ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে বাজেট, তবে সাফল্য নির্ভর করছে কার্যকর বাস্তবায়নে: ফিকি
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধিত্বকারী শীর্ষ সংগঠন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই বা ফিকি) প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে স্বাগত জানিয়েছে। বিশেষ করে ব্যবসা সহজীকরণ এবং ব্যবসার খরচ কমানোর লক্ষ্যে নেওয়া উদ্যোগগুলোর প্রশংসা করেছে সংগঠনটি। তবে ফিকি জোর দিয়ে বলেছে, এসব পদক্ষেপের সাফল্য শেষ পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে এর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করছে।
আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ঢাকার গুলশানে সংগঠনের কার্যালয়ে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ফিকির সহ-সভাপতি মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, "এটি একটি বিনিয়োগ-বান্ধব বাজেট, ...তবে এই ইতিবাচক বার্তার প্রভাব নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে পদক্ষেপগুলো কতখানি মসৃণ ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে তার ওপর।"
তিনি উল্লেখ করেন, আইনি সংস্কার ও বিধি-নিষেধ শিথিলকরণসহ (ডিরেগুলেশন) ব্যবসা সহজীকরণের জন্য অসংখ্য উদ্যোগ নেওয়া হলেও, মাঠপর্যায়ে ব্যবসায়ীরা প্রায়শই এর কাঙ্ক্ষিত সুফল পান না।
তিনি বলেন, "বিধি-নিষেধ শিথিল করাসহ ব্যবসা সহজীকরণের জন্য অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই মাঠপর্যায়ে ব্যবসার পরিবেশ এখনো চ্যালেঞ্জিং রয়ে গেছে। আমাদের দেখতে হবে বাস্তবে এই উদ্যোগগুলো কীভাবে কার্যকর করা হচ্ছে এবং সরকার এদের বাস্তবায়ন কতটা কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।"
সরকারের সংস্কার উদ্যোগগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে ইকবাল চৌধুরী সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন অথবা একজন ন্যায়পাল (ওম্বুডসম্যান) নিয়োগের প্রস্তাব করেন, যিনি ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বাস্তবায়ন অগ্রগতির পর্যালোচনা করবেন এবং প্রয়োজনে সংশোধনমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করবেন।
সংবাদ সম্মেলনে ফিকির সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী প্রস্তাবিত বাজেটকে ইতিবাচক এবং তুলনামূলকভাবে পূর্বাভাসযোগ্য হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশ এখনো কিছু দেশের সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে উৎসাহব্যঞ্জক সাড়া পাচ্ছে।
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, কেবল রাজস্ব ও কর নীতিই বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য যথেষ্ট হবে না। তিনি বলেন, "শুধুমাত্র রাজস্ব নীতি দিয়ে বিনিয়োগ আসবে না। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বিদ্যমান অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর গ্যাস সরবরাহ সমস্যার সমাধান করতে হবে।"
তিনি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় ইউটিলিটি বা পরিষেবা সংযোগের ওপর আরোপিত ৫ শতাংশ সারচার্জের (অতিরিক্ত শুল্ক) বিষয়টির দিকেও ইঙ্গিত করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, "যদি জোনের ভেতরের পরিচালন ব্যয় বাইরের চেয়ে বেশি হয়, তবে বিনিয়োগকারীরা কেন সেখানে বিনিয়োগ করতে চাইবেন?"
বাংলাদেশে শীর্ষস্থানীয় বিদেশি প্রতিষ্ঠান বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী চৌধুরী বলেন, চলমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও—অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকারের প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়। তবে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের (গ্র্যাজুয়েশন) প্রস্তুতির এই সময়ে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে কাঠামোগত কর সংস্কার, নীতিমালার ধারাবাহিকতা এবং ব্যবসার জন্য সমান সুযোগ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
এছাড়া তিনি রাজস্ব আহরণ জোরদার করা, কর কমপ্লায়েন্স বা পরিপালন উন্নত করা, বাণিজ্য সহজতর করা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানোর গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন।
বাণিজ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে কাস্টমস বা শুল্ক বিভাগের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে এই চেম্বার। তাদের সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে—প্রকৃত লেনদেন মূল্য (অ্যাকচুয়াল ট্রানজেকশন ভ্যালু) কিংবা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রেফারেন্স মূল্যের ওপর ভিত্তি করে আমদানি শুল্ক নির্ধারণ করা, কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের সঠিক শ্রেণিবিভাগ (ক্লাসিফিকেশন) নিশ্চিত করা, মূলধনী যন্ত্রপাতির দ্রুত ও মসৃণ শুল্কায়ন (কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স) সহজ করা এবং এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি হিসেবে পর্যায়ক্রমে শুল্কবহির্ভূত বা ট্যারিফ-বহির্ভূত বাধাগুলো দূর করা।
ফিকি একটি ন্যায্য এবং প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তোলার ওপরও জোর দিয়েছে। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর একটি দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ (কুইক-উইন ইনিশিয়েটিভ) হিসেবে চেম্বারটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীনে একটি ডেডিকেটেড ডেটা অ্যান্ড অ্যানালিটিক্স ইউনিট গঠনের প্রস্তাব করেছে, যা বিভিন্ন শিল্পের বাজার অংশীদারিত্বের বিপরীতে তাদের রাজস্ব অবদানের বিশ্লেষণ করবে।
এর পাশাপাশি ফিকি একটি সমন্বিত বা একক ভ্যাট হারের দিকে এগিয়ে যাওয়া, উৎসে কর রেয়াত ও উৎসে ভ্যাট কর্তন ব্যবস্থার ওপর বিধিনিষেধগুলো পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়া এবং আরও মানসম্মত বা প্রমিত ভ্যাট ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেছে।
চেম্বারের বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে ফিকির কর উপদেষ্টা স্নেহাশীষ বড়ুয়া এনবিআরকে কাস্টমস, ভ্যাট এবং আয়কর ব্যবস্থার সমন্বয়ে একটি ব্যাপক অটোমেশন রোডম্যাপ বা স্বয়ংক্রিয়করণ রূপরেখা গ্রহণের আহ্বান জানান, যা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারি সংস্থার সাথেও আন্তঃযোগাযোগ রক্ষা করবে। এছাড়া রাজস্ব সংগ্রহ জোরদার এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর ক্রমাগত উন্নয়নের তাগিদ দেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে ফিকির পরিচালক হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া, নির্বাহী পরিচালক টিআইএম নুরুল কবির এবং চেম্বারের ট্যাক্স কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
