অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানকে প্রাধান্য দিয়ে বাজেটে ১০ অগ্রাধিকার ঘোষণা
অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সংস্কারকে সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে সরকার।
আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, 'এই ১০টি অগ্রাধিকার বিবেচনায় রেখে বাজেট প্রস্তাব দাঁড় করানো হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে দেশের অর্থনীতির বিদ্যমান সংকট এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা মোকাবিলায় স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা।'
অগ্রাধিকারসমূহ
(১) সবার জন্য উন্নয়ন: আমাদের লক্ষ্য সর্বজনের, সর্বশ্রেণীর, সর্বখাতের ও সকল অঞ্চলের সুষম অংশগ্রহণ ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করে বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা।
(২) সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা: সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে বাস্তবমুখী দক্ষতা-নির্ভর ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে যোগ্য মানব সম্পদে পরিণত করা। দ্বিতীয়ত, মৌলিক অধিকার হিসেবে সবার জন্য মানসম্মত সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
(৩) সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা: সর্বজনীন জীবনচক্রভিত্তিক সুরক্ষা বলয় গড়ে তুলতে সকল বয়সের ও সকল স্তরের নাগরিকের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি মজবুত করা।
(৪) বিনিয়োগ-নির্ভর, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি: পরিকল্পিত শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরি এবং যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান ও আয়বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করা। কৃষিকে উৎপাদন, জীবিকা ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার কৌশলগত খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
(৫) বিনিয়ন্ত্রণকরণ এবং সাশ্রয়ী ও সহজিকৃত ব্যবসার পরিবেশ: বিনিয়ন্ত্রণকরণের মাধ্যমে সরকারি কাজে বিলম্ব ও অপ্রয়োজনীয় ধাপ পরিহার করে একটি স্বচ্ছ, সহজ ও সাশ্রয়ী ব্যবসা-সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা।
(৬) আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা: ব্যাংক ও আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করে আমানতকারীদের আস্থা ও দায়বদ্ধতা ফিরিয়ে আনা। পুঁজিবাজার সংস্কারের মাধ্যমে বিনিয়োগে উৎসাহ প্রদান।
(৭) জ্বালানি নিরাপত্তা: উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতের পাশাপাশি সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ-জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আত্মনির্ভরশীল জ্বালানি নিরাপত্তা গড়ে তোলা।
(৮) তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশ: একটি ভবিষ্যৎমুখী, গতিশীল ও প্রকৃত অর্থে প্রযুক্তিগতভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান আইসিটি রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তর করা।
(৯) প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা: জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে দেশকে রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় জনগণের অংশগ্রহণে বনায়নকে একটি সবুজ বিপ্লবে রূপান্তর করা। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে পরিবেশগত বিবেচনার পাশাপাশি নদীসমূহের নাব্য ফিরিয়ে আনা এবং খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় শুরু করার মাধ্যমে একটি টেকসই, সবুজ ও পরিবেশ-সহনশীল বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।
(১০) স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা: টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে মেধাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি সরকারি বিনিয়োগ বাস্তবায়ন দক্ষ ও কার্যকর করে তোলা।
এ সময় অর্থমন্ত্রী বলেন, 'আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনীতিতে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।'
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী এসব অগ্রাধিকারের পাশাপাশি ক্রিয়েটিভ ইকোনমি, স্পোর্টস ইকোনমি, গ্রিন ইকোনমি এবং ব্লু ইকোনমিকে জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা জানান।
তিনি জানান, বাজেট বাস্তবায়নে 'ভ্যালু ফর মানি', 'রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট', কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত বিবেচনাকে প্রধান নীতিগত ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, পরিকল্পিত সংস্কার ও কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে এবং জনমিতিক, দীর্ঘজীবিতা ও গণতান্ত্রিক লভ্যাংশ অর্জন করতে সক্ষম হবে।
তিনি বলেন, 'দেশের অর্থনীতির ভগ্নদশার পাশাপাশি বৈশ্বিক অস্থিরতায় তৈরি হওয়া নতুন ঝুঁকিসমূহ মোকাবিলার প্রত্যয়কে কেন্দ্রে রেখেই আমরা এবারের বাজেটে স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সর্বোপরি ন্যায্যতাকে মূল বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করেছি এবং সামষ্টিক কৌশল নির্ধারণ করেছি।'
