শিল্প সুরক্ষা ও স্থানীয় উৎপাদনে জোর, বাজেটে আমদানি শুল্ক ও কর কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসছে
স্থানীয় শিল্পের বিকাশ, আমদানি বিকল্প পণ্য উৎপাদনে উৎসাহ এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আমদানি শুল্ক ও কর কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কয়েকটি শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে কর সুবিধা বাড়ানো এবং স্থানীয় উৎপাদকদের সুরক্ষায় বিভিন্ন পণ্যের ওপর শুল্ক বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
আগামীকাল (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করা হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ওয়াশিং মেশিন, ইলেকট্রিক ওভেন এবং মাইক্রোওয়েভ ওভেন উৎপাদনকারী শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল ফ্লোট গ্লাস আমদানির ওপর বর্তমানে বিদ্যমান ৪৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হবে। শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে এসব পণ্যের উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং স্থানীয় উৎপাদকরা আরও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারবেন।
অন্যদিকে, এলপিজি সিলিন্ডার, অটো ট্যাঙ্ক এবং ভাল্ব ও বাং উৎপাদনকারী শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান রেয়াতি ও শুল্ক অব্যাহতি সুবিধা আরও এক বছর বাড়িয়ে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে সিনথেটিক ওভেন ফেব্রিক্স আমদানির ক্ষেত্রে বর্তমানে আরোপিত ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করে শূন্য শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে প্রস্তাবিত বাজেটে একদিকে স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষায় প্রতিরক্ষামূলক শুল্ক ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় কমাতে প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর কর ছাড় ও রেয়াতি সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড)-এর চেয়ারপার্সন এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আবুল কসেম খান বলেন, 'যেকোনো ক্ষেত্রে শুল্ক ও কর কাঠামোয় যৌক্তিক হ্রাস স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করে এবং শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ায়। সরকার যখন কাঁচামাল ও মূল্য সংযোজনভিত্তিক উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণের ওপর শুল্ক কমায়, তখন তা স্থানীয় শিল্প, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।'
তিনি বলেন, 'বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় স্থানীয় শিল্পের বিকাশ এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্যবসাবান্ধব শুল্ক কাঠামো অত্যন্ত প্রয়োজন। প্রস্তাবিত এসব সুবিধা উদ্যোক্তাদের আস্থা বাড়াবে এবং উৎপাদন সম্প্রসারণে উৎসাহ জোগাবে। আশা করি, বাজেটে এ বিষয়ে ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যাবে।'
জিপসাম বোর্ড, রেজিন ও ট্রান্সফরমার শিল্পে বাড়তি সুরক্ষা
দেশে গড়ে ওঠা জিপসাম বোর্ড ও শিট উৎপাদনকারী শিল্পকে সুরক্ষা দিতে এসব পণ্য আমদানির ওপর নতুন করে ২০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
একই সঙ্গে পিভিসি রেজিন ও পিইটি রেজিন উৎপাদনকারী শিল্পের সুরক্ষায় বিদ্যমান ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।
দেশীয় উৎপাদকরা বলছেন, এতে আমদানিনির্ভরতা কিছুটা কমবে এবং স্থানীয় শিল্পে বিনিয়োগ ও উৎপাদন সম্প্রসারণে উৎসাহ সৃষ্টি হবে।
এদিকে স্থানীয় ট্রান্সফরমার শিল্পকে শক্তিশালী করতে ১ কেভিএ পর্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্ন ট্রান্সফরমার আমদানির ওপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা এবং অতিরিক্ত ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
ওয়াশিং মেশিন ও সাইকেলের যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক বাড়ছে
স্থানীয় ওয়াশিং মেশিন শিল্পকে সুরক্ষা দিতে সব ধরনের হাউসহোল্ড টাইপ ওয়াশিং মেশিন আমদানির ওপর নতুন করে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সাইকেলের যন্ত্রাংশ 'ফ্রি হুইল'-এর বাজার সুরক্ষায় আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ এবং অতিরিক্ত ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে।
কাগজ, কপার ও স্টিল খাতে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা
দেশীয় কাগজ শিল্পের সুরক্ষায় গ্রিজপ্রুফ পেপার ও গ্লাসিন পেপার আমদানির ওপর শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার পাশাপাশি ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রয়েছে।
কপার তার ও টিউব উৎপাদনকারী শিল্পের সুরক্ষায় কপারের তার আমদানিতে ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক এবং কপার টিউব আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ১৫ শতাংশ শুল্ক বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
স্থানীয় কোল্ড-রোল্ড ও কোটেড কয়েল-শিট উৎপাদনকারী শিল্পের সুরক্ষায় এসব পণ্যের আমদানিতে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
কিছু শিল্পের কাঁচামালে শুল্ক কমছে
রি-ফ্র্যাক্টরি সিমেন্ট শিল্পের প্রধান কাঁচামাল বল ক্লেসহ পাঁচটি কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ডিটারজেন্ট শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল লিনিয়ার অ্যালকাইল বেনজিন (এলএবি) আমদানির ক্ষেত্রে মাত্র ১ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া দেশীয় ফ্লোট গ্লাস শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় পাঁচ ধরনের কাঁচামালের আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় কফি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকে উৎসাহ দিতে কফি এক্সট্র্যাক্ট, এসেন্স ও প্রিপারেশন বাল্ক আকারে আমদানির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
মেইজ স্টার্চ, মোটর ও পলিয়েস্টার শিল্পে সুরক্ষা
স্থানীয় মেইজ স্টার্চ শিল্পকে সুরক্ষা দিতে এ পণ্যের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।
দেশীয় মোটর উৎপাদন শিল্পকে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে ১২০০ ওয়াটের কম ক্ষমতাসম্পন্ন ডিসি মোটর আমদানিতে ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া আমদানি বিকল্প পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার উৎপাদন শিল্পকে উৎসাহ দিতে পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার আমদানির ওপর ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে।
টায়ার, বিউটি ও স্কিন কেয়ার শিল্পে সুবিধা
স্থানীয় টায়ার ও টিউব উৎপাদনকারী শিল্পের দুটি কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে, স্কিন কেয়ার ও বিউটি প্রোডাক্টস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দুটি কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
নতুন শিল্প রেয়াতি প্রজ্ঞাপন আসছে
দেশের শিল্প খাতের সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদানসংক্রান্ত নতুন প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়সহ জনকল্যাণমূলক সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎপাদন শিল্পের মতো মূলধনী যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে আগাম কর অব্যাহতি সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের আশা, এর ফলে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব্যয় কিছুটা কমবে।
ইটিপি ও কয়লা আমদানিতে সুবিধা বহাল
পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নকে উৎসাহ দিতে ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) পরিচালনায় প্রয়োজনীয় রাসায়নিক আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান শুল্ক অব্যাহতি সুবিধা আগামী ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে, দেশের বিদ্যুৎ খাতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক ও কর রেয়াত সুবিধার মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়িয়ে ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ইটিপি পরিচালনায় ব্যবহৃত রাসায়নিক আমদানিতে শুল্ক অব্যাহতি সুবিধা বহাল থাকলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও পরিচালন ব্যয় কমবে। ফলে পরিবেশগত বিধি মেনে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হবে। এতে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, চামড়াসহ রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে এবং পরিবেশবান্ধব নতুন বিনিয়োগও উৎসাহিত হতে পারে।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি মো. শাহিন আহমেদ টিবিএসকে বলেন, 'শুল্ক অব্যাহতি পরিবেশবান্ধব নতুন বিনিয়োগে ব্যবসায়ীরা উৎসাহিত হবে।'
