ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরাতে আমানত সুরক্ষা শক্তিশালী করছে সরকার: অর্থমন্ত্রী
আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সুসংগঠিত ও বহুমাত্রিক কাঠামোর আওতায় সরকার বেশ কিছু সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
আজ মঙ্গলবার (৯ জুন) ১৩তম জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের তৃতীয় বৈঠকে এবং প্রথম বাজেট অধিবেশনে কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমানের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, এই পদক্ষেপগুলোর আইনি ভিত্তি হিসেবে 'ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫' প্রণয়ন করা হয়েছে এবং এর অধীনে 'ব্যাংক রেজল্যুশন স্কিম ২০২৫' বাস্তবায়ন করা হয়েছে। পরবর্তীতে এই অধ্যাদেশটি 'ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬' হিসেবে পাস করা হয়।
ব্যাংকিং খাতের সংকট নিরসনের অংশ হিসেবে পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ইসলামি ব্যাংককে একীভূত করে 'সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি' গঠন করা হয়েছে।
মন্ত্রী এই পদক্ষেপকে আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করেন।
আমির খসরু আরও জানান, আমানত সুরক্ষা আইন ২০২৬'-এর মাধ্যমে বড় ধরনের সংস্কার আনা হয়েছে, যেখানে বিমাকৃত আমানতের সর্বোচ্চ পরিমাণ ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে। এছাড়া এর আগে ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর আমানতকারীরা সুরক্ষা সীমার বাইরে থাকলেও, নতুন আইনের মাধ্যমে তাদেরও এই নিরাপত্তার আওতায় আনা হয়েছে।
সংসদে অর্থমন্ত্রী বলেন, 'সামগ্রিকভাবে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো, স্বচ্ছ রেজল্যুশন প্রক্রিয়া এবং আমানতকারীদের জন্য শক্তিশালী সুরক্ষা ব্যবস্থা ব্যাংকিং খাতের ওপর আমানতকারী ও অংশীজনদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।'
ঋণ আদায় পরিস্থিতির উন্নতি এবং খেলাপি ঋণের (এনপিএল) পরিমাণ কমিয়ে আনতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, 'এর মধ্যে রয়েছে—যথাযথ কারণে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ গ্রাহকদের নীতিমালা সহায়তা প্রদান, উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ থাকা ব্যাংকগুলোর জন্য বিশেষ ঋণ শ্রেণিকরণ নিরসন কৌশল নির্ধারণ এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ।'
আমির খসরু জানান, ব্যাংকগুলোকে তাদের আইনি বিভাগ আরও শক্তিশালী করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি ব্যাংককে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) ব্যবস্থার মাধ্যমে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে তাদের মোট খেলাপি ঋণের অন্তত ১ শতাংশ নগদ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে।
অন্যান্য সংস্কারমূলক পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে—'ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন' যুগোপযোগী করা, প্রতিটি ব্যাংকার্স মিটিংয়ে শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছ থেকে ঋণ আদায়ের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা এবং যেসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, সেখানে ঋণ আদায়ের জন্য বিশেষ মনিটরিং টিম গঠন করা।
মন্ত্রী আরও জানান, ঋণ ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত করতে এবং ঝুঁকি কমাতে আইএফআরএস-৯ অনুযায়ী 'এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস' ভিত্তিক ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিং নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি ব্যাংকের নিজস্ব মূল্যায়নের পাশাপাশি ঋণের বিপরীতে রাখা জামানত যাচাইয়ের জন্য তালিকাভুক্ত পেশাদার মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
সংসদে অর্থমন্ত্রী জানান, সরকার আরও কিছু ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—কৃষি ঋণ পুনঃতফসিল নীতিমালা আধুনিকায়ন, সাধারণ ঋণখেলাপি ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের আলাদা তালিকা প্রকাশ, ভালো ঋণগ্রহীতাদের জন্য প্রণোদনা স্কিম সংশোধন, একক গ্রাহকের জন্য ঋণসীমা পুনঃনির্ধারণ এবং অভ্যাসগত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে আইনি সংস্কার।
তিনি বলেন, 'সরকার অর্থঋণ আদালতের জুরি বোর্ডে অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করছে। এছাড়া রিট পিটিশনের মাধ্যমে খেলাপিরা যাতে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করতে না পারে, সেজন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ১০ বিলিয়ন (এক হাজার কোটি) টাকার বেশি অর্থায়নপ্রত্যাশী কোম্পানিগুলোকে সরাসরি ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর না করে বন্ডের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
তদুপরি, ব্যাংকগুলোর মন্দ ঋণ (ডিসট্রেসড অ্যাসেট) ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় বেসরকারি খাতে 'অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি' প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিতে নতুন আইন প্রণয়নের কাজ চলছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।
