ডিজিটাল ইকোসিস্টেম তৈরিতে কৌশলগত বিনিয়োগ: যেভাবে সুফল পাচ্ছে বিকাশ
২০১১ সালে হাতেগোনা কয়েকটি মৌলিক আর্থিক সেবা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল 'বিকাশ'। দেড় দশকের পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি এখন গ্রাহকদের ২০০টিরও বেশি সেবা প্রদান করছে।
গ্রাহক চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ, শক্তিশালী সেবা অবকাঠামো তৈরি এবং নিত্যনতুন উদ্ভাবনী পণ্য নিয়ে আসার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ আর্থিক সেবার প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। একই সাথে এটি গ্রাহকদের দৈনন্দিন লেনদেনের অভ্যাসেও ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে।
ডিজিটাল লেনদেনের ইকোসিস্টেমকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটির গৃহীত দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগ এখন সুফল বয়ে আনছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে এমএফএস খাতের অন্যতম শীর্ষ মুনাফা অর্জনকারী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশের সর্বশেষ বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তারা ৬৬১ কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করেছে, যা ২০২৪ সালের (৩১৫.৭৭ কোটি টাকা) মুনাফার দ্বিগুণেরও বেশি।
উল্লেখ্য, কৌশলগত কারণে ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠানটি ১১৭.২৯ কোটি টাকা লোকসানে ছিল।
২০২৫ সালে মুনাফা বৃদ্ধির মূল কারিগর ছিল নতুন নতুন সেবা এবং প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, যা বিভিন্ন ব্যবসায়িক খাতে বিকাশের প্রবেশাধিকার বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০২১ সালেই প্রতিষ্ঠানটির বাজার অংশীদারিত্ব বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৬০ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যা ১৫০ শতাংশ বেড়ে ৮ কোটি ২০ লাখে পৌঁছেছে।
দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি বা 'পেশেন্ট ক্যাপিটাল'
শুরু থেকেই বিকাশের বিনিয়োগকারীরা 'পেশেন্ট ক্যাপিটাল' বা 'দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি'র নীতি অনুসরণ করে আসছেন। তারা লভ্যাংশ না নিয়ে মুনাফার পুরো অর্থ পুনরায় ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। এই কৌশলের কারণেই বিকাশ শক্তিশালী প্রযুক্তিগত ভিত্তি গড়তে এবং কার্যকরভাবে সময়োপযোগী সেবা সম্প্রসারণ করতে সক্ষম হয়েছে।
২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর কৌশলগত লোকসান গুনেছে বিকাশ। কারণ ওই সময় তাৎক্ষণিক মুনাফার চেয়ে এই খাতের উন্নয়ন এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোতেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। এমনকি লোকসানের ওই সময়েও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিকাশের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের প্রতি আস্থাশীল ছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, ২০২১ সালে বিকাশ যখন লোকসানে ছিল, ঠিক তখনই সফটব্যাংক ইক্যুইটি পার্টনার হিসেবে যুক্ত হয়। যাত্রার শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিকাশ প্রায় ৩৮১ মিলিয়ন ডলার বা ৪,৫০০ কোটি টাকারও বেশি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ করেছে।
ব্যক্তিগত আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্ল্যাটফর্ম
আগে মানুষ মূলত মোবাইল রিচার্জ এবং টাকা পাঠানোর জন্য এমএফএস প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করত। কিন্তু দৈনন্দিন লেনদেনকে আরও সহজ ও নিরাপদ করতে নতুন নতুন সেবা উদ্ভাবনে ধারাবাহিক বিনিয়োগ করেছে বিকাশ। আর সেই সেবাগুলো গ্রাহকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সারা দেশে বিশাল এজেন্ট নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। শুরুতে মাত্র চারটি সেবা (সেন্ড মানি, ক্যাশ আউট, ক্যাশ ইন এবং মোবাইল রিচার্জ) নিয়ে শুরু করলেও বর্তমানে বিকাশ অ্যাপে ২০০টিরও বেশি সেবা রয়েছে।
বর্তমানে বিকাশ অ্যাপে অনেক অতিরিক্ত ফিচার যুক্ত হয়েছে। যেমন—গ্রাহকরা মোবাইল রিচার্জে 'অটো-পে' ব্যবহার করতে পারছেন, যার ফলে প্রতিবার ম্যানুয়ালি রিচার্জ করার প্রয়োজন হয় না।
বিদ্যুৎ বিলের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট তারিখের আগে রিমাইন্ডার পাওয়া যায়। আবার যারা প্রতি মাসে নির্দিষ্ট দিনে 'সেন্ড মানি' করেন, তারা অটো-পে চালু করে চাপমুক্ত থাকতে পারেন। অ্যাপের 'আমার বিকাশ' অপশন থেকে গত ছয় মাস বা এক বছরে কোন সেবায় কত টাকা খরচ হয়েছে, তা 'গ্রাফিক্যাল রিপ্রেজেন্টেশন'-এর মাধ্যমে দেখা যায়। এই ফিচারগুলো গ্রাহকদের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আরও সক্ষমতা আনছে।
পাশাপাশি বিভিন্ন আর্থিক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিকাশ একটি শক্তিশালী ইকোসিস্টেম তৈরি করেছে। বর্তমানে ৪৫টিরও বেশি ব্যাংকের সঙ্গে আন্তঃলেনদেন সুবিধা এবং ভিসা ও মাস্টারকার্ডের মতো আন্তর্জাতিক কার্ড থেকে টাকা যোগ করার সুবিধাও যুক্ত রয়েছে।
রেমিট্যান্স প্রবাহকেও সহজ করেছে বিকাশ। বর্তমানে বিশ্বের ১৭০টি দেশ থেকে প্রায় ১৪০টি মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরাসরি বিকাশ অ্যাকাউন্টে রেমিট্যান্স পাঠানো যাচ্ছে।
এছাড়া আয়কর দেওয়ার প্রয়োজনে বিকাশ অ্যাপ থেকে রেমিট্যান্স স্টেটমেন্টও ডাউনলোড করা সম্ভব।
'ছোট ফিচার, বড় বিনিয়োগ'
বিকাশের হেড অব করপোরেট কমিউনিকেশনস শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম বলেন, 'বাইরে থেকে অনেক ফিচার খুব ছোটো মনে হলেও, এগুলোর নেপথ্যে রয়েছে যথাযথ বিনিয়োগ এবং দক্ষ কর্মীবাহিনীর সমন্বয়।'
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, 'আগে পেমেন্টের রিসিট শেয়ার করার আগে গ্রাহককে ম্যানুয়ালি ব্যালেন্সটিকে মুছে দিতে হতো, এখন অ্যাপ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তা লুকিয়ে ফেলে। আবার কার্ডের তথ্য সেভ করা, বিলের তথ্য সংরক্ষণ করার মতো অনেক ফিচার যুক্ত করা হয়েছে, ফলে এখন আর কাগজে বিল সংরক্ষণ করতে হয় না। এই ধরনের ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো গ্রাহক অভিজ্ঞতায় স্বস্তি এনেছে। আমরা আমাদের ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতার প্রতিটি মুহূর্তকে আরও স্বাচ্ছন্দ্যময় করার চেষ্টা করছি। এ কারণেই প্রতিবার বিকাশের অ্যাপ আপডেটে নতুন নতুন ফিচার যুক্ত হয়।'
বিকাশের অন্যতম লক্ষ্য হলো পেমেন্ট নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা। এ বিষয়ে ডালিম বলেন, 'আমরা ক্যাশলেস সমাজ গড়ে তুলতে চাইলে সর্বত্র পেমেন্ট সুবিধা থাকতে হবে। আমরা ইতোমধ্যে প্রায় ১০ লাখ মার্চেন্টকে যুক্ত করেছি, যেখানে গ্রাহকরা কিউআর কোড স্ক্যান বা এনএফসি ট্যাপ করে পেমেন্ট করতে পারছেন।'
তিনি আরও জানান, পরবর্তী পদক্ষেপ হলো রাস্তার পাশের বিক্রেতাদের কাছে পৌঁছানো এবং দৈনন্দিন লেনদেনে অভ্যাসের বিবর্তন ঘটানো।
তিনি বলেন, 'আমাদের যাত্রার দিকে তাকালে দেখবেন, এটি শুরু হয়েছিল আর্থিক অন্তর্ভুক্তি দিয়ে। এরপর আমরা প্রতিদিনের লেনদেনকে সহজ করার দিকে নজর দিই এবং তার ধারাবাহিকতায় এখন ইকোসিস্টেমকে শক্তিশালী করছি।'
ডালিম আরও বলেন, 'বর্তমানে প্রায় ১,৮০০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের টিউশন ফি এবং ২,৪০০-এর বেশি ইউটিলিটি সার্ভিসের বিল বিকাশের মাধ্যমে দেওয়া যাচ্ছে। প্রায় ১০ লাখ পোশাক শ্রমিক এখন বিকাশের মাধ্যমে বেতন পাচ্ছেন।'
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে সঞ্চয় ও ঋণ সেবা চালু করা হয়েছে, যা ব্যাংক সেবার বাইরে থাকা বহু মানুষকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবায় যুক্ত করেছে। এ বিষয়ে ডালিম বলেন, 'উদাহরণস্বরূপ, ব্যবহারকারীরা এখন প্রতি মাসে সর্বনিম্ন ২৫০ টাকা থেকে শুরু করে ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয় করতে পারছেন। আমরা এটি চালু করার পর অনেক ব্যাংকও অনুরূপ সেবা দিতে শুরু করেছে।'
তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে বিকাশ ৪৫টি ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত এবং বেশ কয়েকটি ব্যাংক ও অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সঞ্চয় সেবা প্রদান করছে। লোন বা ঋণ সুবিধার ক্ষেত্রে তিনি জানান, লেনদেনের তথ্য ব্যবহার করে ব্যাংকগুলো এখন অনেক সহজে লোন দিচ্ছে, যেখানে গ্রাহকের আর্থিক আচরণের ওপর ভিত্তি করে জামানত ছাড়াই ঋণ পাওয়া যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে ডালিম বলেন, 'আইডিএলসি-র উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। বিকাশের সঙ্গে অংশীদারিত্বের আগে তাদের গ্রাহক ছিল প্রায় ৫০ হাজার, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখে।'
বিকাশের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, 'বিকাশের কাজ হলো উদ্ভাবন করা, নতুন পণ্য আনা এবং ডিজিটাল লিটারেসি বা সচেতনতা বাড়ানো। আমরা ক্রমাগত প্রযুক্তি ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করছি।'
তিনি আরও বলেন, 'এর মধ্যে রয়েছে সার্ভার, ক্লাউড সিস্টেম এবং নিরাপত্তার নিয়মিত আধুনিকায়ন। প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হয়, তাই ধারাবাহিক বিনিয়োগ অপরিহার্য। আমাদের বিনিয়োগকারীরা বিষয়টি বোঝেন, যে কারণে তাঁরা লভ্যাংশ না নিয়ে পুনরায় বিনিয়োগ করেন।'
প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান মুনাফা প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বছরের পর বছর ধরে করা বিনিয়োগেরই প্রতিফলন বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, 'আমরা গ্রাহক সচেতনতা এবং কীভাবে নিরাপদে ডিজিটাল লেনদেন করা যায় ও প্রতারণা এড়ানো যায়, সেই শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দিই। এর ফলে শুধু বিকাশ নয়, পুরো ইন্ডাস্ট্রিই উপকৃত হচ্ছে।'
ডালিম আরও উল্লেখ করেন, কোম্পানি তাদের অ্যাপে বড় ধরনের আধুনিকায়ন এনেছে, যার মধ্যে রয়েছে 'মাই বিকাশ' ফিচার। এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ব্যবহারকারীর আচরণের ওপর ভিত্তি করে অ্যাপের ইন্টারফেস স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাজিয়ে দেয়।
তিনি বলেন, 'প্রতিটি ব্যবহারকারীর অ্যাপ আলাদা দেখায়, যেখানে তাদের নিয়মিত কন্টাক্ট, পছন্দের এজেন্ট, সঞ্চয় ও ঋণের তথ্য প্রদর্শিত হয়। এর জন্য এআই এবং সুরক্ষিত ডেটা স্টোরেজের মতো উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়। গত ১৫ বছরের এই সামগ্রিক প্রচেষ্টাই আমাদের বর্তমান অবস্থান ও মুনাফায় অবদান রেখেছে।'
