৫ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশল ব্যবহারে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬.২% প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সরকারের
অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এবং বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধির দিকে অগ্রসর হওয়ার লক্ষ্যে একটি পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো প্রণয়ন শুরু করেছে সরকার। এতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৬.২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্ভাব্য ৫ শতাংশ থেকে বেশি।
সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা কমিটির প্রথম বৈঠকে উপস্থাপিত প্রস্তাবিত কাঠামোয় পরবর্তী বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৭.১ শতাংশ, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৭.৫ শতাংশ এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৩৬.৭ শতাংশে উন্নীত করা এবং একই সময়ে মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা কমিটির প্রথম বৈঠকে উপস্থাপিত এক প্রক্ষেপণে চলতি অর্থবছরসহ পরবর্তী চার বছরে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার ধীরে ধীরে অবমূল্যায়নের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ডলারের বিপরীতে বিনিময় হার ১২৬.৩ টাকায় পৌঁছাতে পারে। পরবর্তী বছরগুলোতে তা ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১৩১ টাকা, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ১৩৪.৯ টাকা, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ১৩৮ টাকা এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ১৪০ টাকায় পৌঁছাতে পারে।
সরকার বিনিময় হার যৌক্তিকীকরণ, জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করা এবং ব্যবসায়িক লাইসেন্সিং ব্যবস্থায় দ্রুত সংস্কারের লক্ষ্যে ১৮০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা চালু করার পরিকল্পনা করেছে।
এক বছর মেয়াদি কর্মসূচির মধ্যে থাকবে— আর্থিক খাতের পুনর্গঠন, সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা প্ল্যাটফর্ম গঠন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন সম্প্রসারণ।
পাঁচ বছর মেয়াদে সরকার শিল্পখাতের বহুমুখীকরণ, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে এগোতে চায়।
গতকাল (১৫ এপ্রিল) প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, পরিকল্পনার প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হবে এবং এগুলো অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দেবে।
তিনি বলেন, 'আগামী এক বছরের মধ্যে পুনর্বাসন কার্যক্রমও সম্পন্ন করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।'
বৈঠকে উপস্থাপিত নথিতে দেখা গেছে, এই কাঠামোর লক্ষ্য— মূলধনের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বিভিন্ন খাতে প্রায় এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রাজস্ব আদায় জিডিপির ১০ শতাংশে উন্নীত করা।
বিএনপি সরকারের প্রথম পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা, বেসরকারি খাতের জন্য পেনশন তহবিল গঠন, বেকার ভাতা চালু এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও কুটির শিল্পের জন্য সুদমুক্ত ঋণ প্রদানের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
পরিকল্পনায় বেসরকারি সংস্থা থেকে নেওয়া সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের প্রস্তাবও রয়েছে।
সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ জিডিপির ২.৫ শতাংশে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
এই কাঠামোতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, ব্লু ইকোনমি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এতে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনায় প্রায় এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে পাঁচ লাখ মানুষকে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের লক্ষ্যও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সামাজিক খাতে প্রায় চার কোটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য 'ফ্যামিলি কার্ড' কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয় ধীরে ধীরে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রস্তাবিত কাঠামোয় শাসনব্যবস্থার নানা সংস্কারের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছরে সীমিত করা, ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষসহ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ চালু করা এবং নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা।
পরিকল্পনায় বর্তমান ৪৯৫.১৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে নামমাত্র জিডিপি ৭৪২.৫৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ।
বৈঠক শেষে ড. তিতুমীর বলেন, নতুন এই কাঠামো অতীতের 'বাস্তবতাবিচ্ছিন্ন ও সংখ্যাকেন্দ্রিক' পরিকল্পনা থেকে সরে এসে বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বাস্তবভিত্তিক কৌশলের ওপর গুরুত্ব দেবে।
তিনি বলেন, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং স্পষ্ট বাস্তবায়ন রোডম্যাপ তৈরি করা নতুন পরিকল্পনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হবে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, দেশ বর্তমানে একটি নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি এবং সরকার একটি দুর্বল সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। তিনি বলেন, 'লক্ষ্য হচ্ছে পুনরুদ্ধার থেকে দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির পথে অগ্রসর হওয়া।'
তিনি আরও বলেন, অতীতে উন্নয়ন পরিকল্পনার বাস্তবায়নে ঘাটতি ছিল এবং সরকার ইতোমধ্যে বিদ্যমান পরিস্থিতি মূল্যায়ন, অতীত ফলাফল পর্যালোচনা এবং চলমান প্রকল্পসমূহ পুনর্মূল্যায়ন শুরু করেছে।
জিইডির সদস্য ড. মনজুর আহমেদ বলেন, সরকারের প্রথমে দুই বছরের পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা নেওয়ার চিন্তা ছিল, তবে নির্বাচিত সরকার গঠনের পর এটি পাঁচ বছর মেয়াদি সমন্বিত কৌশলগত পরিকল্পনায় রূপ নিয়েছে।
তিনি বলেন, দুই মাসের মধ্যে একটি খসড়া প্রস্তুত করা হবে এবং এরপর অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ করা হবে।
বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার আগে পরবর্তী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে চূড়ান্ত নথি প্রস্তুত করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
