এলপিজি আমদানিতে একক গ্রাহকের ঋণসীমা শিথিল করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দেশের বাজারে এলপিজি গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং আমদানি বাড়াতে বড় ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে এলপিজি আমদানিকারকদের জন্য একক ঋণগ্রহীতার ঋণসীমা শিথিল করা হয়েছে।
এর ফলে বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন থেকে একটি ব্যাংক থেকেই আগের চেয়ে বেশি পরিমাণ ঋণ নিয়ে এলপিজি আমদানি করতে পারবে। বুধবার (২৫ মার্চ) এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে সব ব্যাংকের কাছে পাঠানো হয়েছে।
গত ২৪ মার্চ অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এই অব্যাহতি প্রদানের নির্দেশনা দেওয়া হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী, এলপিজি আমদানিতে একক ঋণগ্রহীতার ঋণসীমা সম্প্রসারণের এই সুবিধা চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো একটি গ্রুপ বা প্রতিষ্ঠান একটি ব্যাংকের মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ (ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড মিলে) ঋণ পেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যাংকের মূলধন ১০০০ কোটি টাকা হলে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান সেখান থেকে ২৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিতে পারে না।
তবে নতুন সিদ্ধান্তের ফলে এলপিজি আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে এই ২৫ শতাংশের সীমা অতিক্রম করার সুযোগ তৈরি হলো। তবে এই সীমা কত শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হবে, তা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের আবেদনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারণ করে দেবে। শুধুমাত্র এলপিজি আমদানিকারকদের জন্যই এই বিশেষ সুবিধা প্রযোজ্য হবে; অন্য কোনো পণ্য আমদানিতে এই সুবিধা পাওয়া যাবে না।
নন-ফান্ডেড ঋণ বলতে সাধারণত এলসি বা ব্যাংক গ্যারান্টির মতো সুবিধাকে বোঝায়, যেখানে ব্যাংক সরাসরি নগদ টাকা না দিয়ে গ্রাহকের পক্ষে তৃতীয় পক্ষকে নিশ্চয়তা প্রদান করে।
এ বিষয়ে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, 'বড় কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর জন্য একটি ব্যাংক থেকে নন-ফান্ডেড ঋণ নেওয়া কঠিন ছিল, কারণ সীমার কারণে তাদের একাধিক ব্যাংকে ঘুরতে হতো। এখন সীমা বাড়ানোয় একটি ব্যাংক থেকেই প্রয়োজনীয় ঋণ নেওয়া যাবে, যা ব্যাংক ম্যানেজমেন্টকে সহজ করবে। এটি ব্যাংক ও কর্পোরেট কোম্পানি—উভয়ের জন্যই 'উইন-উইন' সিচুয়েশন। তবে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রাহকের অবস্থা বুঝে ব্যাংককে সর্তক থাকতে হবে, যাতে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি না থাকে।'
ওমেরা এলপিজির সিএফও আতিয়ার রহমান জানান, বড় গ্রুপগুলোর ঋণের চাহিদা অনেক বেশি থাকে। অনেক সময় ব্যাংক সেই চাহিদা মেটাতে পারে না। এই সুবিধার ফলে যেসব ব্যাংকের ডলার সক্ষমতা বেশি, আমদানিকারকরা তাদের মাধ্যমেই সহজে এলপিজি আমদানির এলসি খুলতে পারবেন।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, 'এলপিজি গ্যাসের সঠিক সরবরাহ নিশ্চিত করতেই এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমানে অর্থনীতির যে অবস্থা, তাতে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে যাতে ঝুঁকি তৈরি না হয়।'
বেসরকারি ব্যাংকের একাধিক উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছেন, এর আগে নীতি সহায়তার মাধ্যমে অনেক খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এই নতুন সুবিধার ক্ষেত্রেও ব্যাংকগুলোকে প্রুডেনশিয়াল ব্যাংকিং নিশ্চিত করতে হবে।
চলতি মাসেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জানানো হয়, দেশে এলপিজির চাহিদার ৯৮ শতাংশই বেসরকারি খাতের আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়। বিশেষ করে শীতকালে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় এলপিজির চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীলতা এবং ঋণসীমার জটিলতায় আমদানিকারকরা পর্যাপ্ত এলসি খুলতে পারছিলেন না, যার ফলে বাজারে তীব্র সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি এলপিজি আমদানিকারকদের সাথে বাণিজ্যমন্ত্রীর এক সভায় ব্যবসায়ীরা এলসি খোলার জটিলতা দূর করার অনুরোধ জানানোর পরই সরকার এই পদক্ষেপ নিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এলপিজি আমদানিতে কোনো জটিলতা যাতে না হয়, সেজন্যই এই সীমা শিথিল করা হয়েছে। আমদানিকারকরা আবেদন করলে এবং ব্যাংকের আপত্তি না থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্রুত অনুমোদন দেবে।
