চট্টগ্রাম বন্দর: কর্মীরা কাজে ফিরলেও কাটছে না জট, প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপে বাড়ছে উত্তেজনা
টানা ছয় দিনের কর্মবিরতির পর শুক্রবার থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে সীমিত পরিসরে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে বিশাল কনটেইনার জট, জাহাজের জটলা এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের নেওয়া নতুন প্রশাসনিক পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে বন্দরে এখনও চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলেছেন, কর্মবিরতির ফলে সৃষ্ট অচলাবস্থায় এমন এক চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি হয়েছে যা রপ্তানি সূচিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, ব্যয় বাড়াবে এবং বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা কমিয়ে দেবে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে শ্রমিক নেতারা টানা কর্মবিরতি দুই দিনের জন্য স্থগিত করার ঘোষণা দিলেও ভাটা এবং রাতে জাহাজ চলাচলের সীমাবদ্ধতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। শুক্রবার সকালে জোয়ারের সময় জেটিতে আটকে থাকা জাহাজগুলো বের করে দেওয়ার পর বহির্নোঙরে অপেক্ষায় থাকা জাহাজগুলোকে জেটিতে আনা হয়।
পুরোদমে কার্যক্রম শুরু হতে হতে শুক্রবার বিকেল হয়ে যায়। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে ইয়ার্ড থেকে কনটেইনার ডেলিভারি এবং ডিপো থেকে কনটেইনার আসা শুরু হলেও শুক্রবার সকালে টার্মিনাল গেটগুলোতে ট্রাকের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
বন্দর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ছয় দিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে। বর্তমানে বন্দরের ইয়ার্ডগুলোতে ৩৮ হাজার টিইইউএস-এর বেশি কনটেইনার জমা হয়ে আছে, যার মধ্যে ২৯ হাজার ইউনিটের বেশি এফসিএল (ফুল কনটেইনার লোড) কনটেইনার। এছাড়া প্রায় ১ হাজার ৫০০ কনটেইনার বেসরকারি ডিপোতে এবং ১ হাজার ৭৫০টি কনটেইনার কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর (আইসিডি) উদ্দেশ্যে পাঠানোর অপেক্ষায় আছে।
রপ্তানির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রায় ১,০০০ টিইইউএস রপ্তানি কনটেইনার বন্দরের ভেতরে আটকে আছে এবং ১৩,০০০-এর বেশি রপ্তানি কনটেইনার বেসরকারি আইসিডিগুলোতে পড়ে আছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে নতুন রপ্তানি পণ্য আসা শুরু হলেও নতুন ও পুরনো জট সামলানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বহির্নোঙরেও জাহাজের জট বেড়েছে। সেখানে বর্তমানে জ্বালানি তেল ও গ্যাস বহনকারী ট্যাঙ্কার, ৫০টির বেশি কনটেইনার জাহাজ এবং ১০০টির বেশি বাল্ক ক্যারিয়ার অপেক্ষায় আছে। প্রতিদিন নতুন জাহাজ আসায় বার্থিং শিডিউল সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা।
ক্ষতিপূরণ ব্যয় ও রপ্তানি ঝুঁকি
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া তিন দিনের আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি এবং পরবর্তী তিন দিনের টানা কর্মবিরতিতে শত শত কোটি টাকার আমদানি-রপ্তানি পণ্য ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বহির্নোঙরে অপেক্ষায় থাকা জাহাজগুলোর জন্য প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ গুনতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মতে, জাহাজ ভেদাভেদে প্রতিদিন গড়ে ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক এবং বাংলাদেশ ফ্রেট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহ-সভাপতি খায়রুল আলম সুজান সতর্ক করে বলেন, 'আসল সংকট সামনে আসছে। বিভিন্ন ডিপোতে ১৪ হাজারেরও বেশি রপ্তানি কনটেইনার আটকে আছে এবং অনেকগুলো ফিডার ভেসেল নির্ধারিত পণ্য না নিয়েই ছেড়ে গেছে। এর ফলে পরবর্তী জাহাজগুলোতেও জায়গা পাওয়া কঠিন হবে এবং এই জট কাটিয়ে উঠতে অন্তত দুই থেকে আড়াই মাস সময় লাগতে পারে।'
তিনি আরও বলেন, 'এটি কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, বাংলাদেশের ভাবমূর্তিরও বড় ক্ষতি। মাদার ভেসেলের স্পেস সংকটের কারণে ইউরোপ-আমেরিকায় সঠিক সময়ে পণ্য পৌঁছানো অনিশ্চিত হয়ে পড়বে, যা ক্রেতাদের আস্থায় বড় আঘাত হানবে।'
বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী বলেন, 'সীমিত সক্ষমতার মধ্যে জাহাজের বাড়তি চাপ সামলাতে বার্থ অপারেটররা এখন প্রচণ্ড চাপের মুখে আছেন। বন্দর চালু হলেও পুরো সিস্টেমটি এখন ক্লান্ত। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে চব্বিশ ঘণ্টা সমন্বিত কাজ প্রয়োজন।'
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, 'বন্দর কর্তৃপক্ষ জট কমাতে এবং দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে।'
১৫ কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুদক তদন্ত ও বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার আবেদন
পরিস্থিতি যখন স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে, ঠিক তখনই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সাম্প্রতিক আন্দোলনে জড়িত ১৫ জন কর্মচারীর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ তদন্ত করতে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) চিঠি দিয়েছে। একই সঙ্গে তাদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ারও অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রিফায়েত হামিম স্বাক্ষরিত এই চিঠি নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে পাঠানো হয়েছে। চিঠির অনুলিপি নৌ-পরিবহন উপদেষ্টার দপ্তর, দুদক এবং জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালকের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
শ্রমিকদের কর্মবিরতি স্থগিত করার ঘোষণার পরপরই এই পদক্ষেপ নেওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এর আগে নৌ-পরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের সাথে বৈঠকের পর 'চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ' দুই দিনের জন্য বিরতি ঘোষণা করেছিল। পরিষদের সমন্বয়ক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির বলেছিলেন, উপদেষ্টার আশ্বাস বাস্তবায়ন না হলে রবিবার থেকে পুনরায় কর্মবিরতি শুরু হবে।
চিঠিতে যে ১৫ জন কর্মচারীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা হলেন: মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির (সমন্বয়ক, যাকে মোংলা বন্দরে বদলি করা হয়েছে), মোহাম্মদ ইব্রাহিম খোকন (পায়রা বন্দরে বদলি), মোহাম্মদ ফরিদুর রহমান, মোহাম্মদ শফি উদ্দিন, রাশিদুল ইসলাম, আবদুল্লাহ আল মামুন, মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম, খন্দকার আসাদুজ্জামান, মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির (এসএস পেইন্টার), মোহাম্মদ শাকিল রায়হান, মানিক মিঝি, মোহাম্মদ শামসু মিয়া, মোহাম্মদ লিয়াকত আলী, আমিনুর রসুল বুলবুল এবং মোহাম্মদ রব্বানি।
চিঠিতে অভিযোগ করা হয়েছে, এই কর্মচারীরা 'রাষ্ট্রবিরোধী' কাজে লিপ্ত ছিলেন এবং তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। চিঠির একটি অংশ বিশেষ করে দুদকের জন্য রাখা হয়েছে, যেখানে তাদের সম্পদের তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে মন্তব্য করার জন্য বন্দর পরিচালক ওমর ফারুক ও সচিব সৈয়দ রিফায়েত হামিমকে ফোন করা হলেও তারা সাড়া দেননি।
শ্রমিকদের প্রতিক্রিয়া ও পুনরায় আন্দোলনের হুমকি
চিঠির বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, 'রমজান মাস এবং উপদেষ্টার আশ্বাসের কথা বিবেচনা করে তারা আন্দোলন স্থগিত করেছিলেন। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত উসকানিমূলক এবং অবমাননাকর। এটি সমঝোতার পথ বন্ধ করে দিয়েছে।'
তিনি জানান, পরিষদের পক্ষ থেকে সন্ধ্যায় বৈঠক করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
উল্লেখ্য, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত শনিবার থেকে আন্দোলন করে আসছে শ্রমিকরা। আন্দোলনের মুখে সংলাপের পরিবর্তে বন্দর কর্তৃপক্ষ কয়েকজনকে বদলি করলে উত্তেজনা আরও বাড়ে।
