মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ: নতুন ব্যাংকটি কীভাবে ঋণগ্রহীতা ও আমানতকারীদের সেবা দেবে?
অন্তর্বর্তী সরকার সম্প্রতি ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দিয়ে একটি অধ্যাদেশ জারি করেছে। মূলত সামাজিক ব্যবসা হিসেবে পরিচালিত এসব ব্যাংক চালুর মাধ্যমে দেশে ক্ষুদ্রঋণ দেওয়ার পদ্ধতি, নিয়ন্ত্রণ ও অর্থায়নে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা হলো।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদারের উদ্যোগ হিসেবে প্রণীত 'মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৬'–এ আমানত গ্রহণকারী মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংকের ধারণা যুক্ত করা হয়েছে।
পাশাপাশি কঠোর শাসনব্যবস্থা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকির বিধান আনা হয়েছে, যার ফলে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা একটি খাতের মৌলিক রূপান্তর ঘটছে।
দেশে পরিচালিত অন্যান্য ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে আমানত সংগ্রহের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দিয়েই মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে অধ্যাদেশ জারি করেছে সরকার। সামাজিক ব্যবসা মডেলে পরিচালনার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকটি ঋণগ্রহীতাদের পাশাপাশি যেকোন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে আমানত সংগ্রহ করতে পারবে।
ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে গত বুধবার আইন মন্ত্রণালয়ের জারি করা অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, ব্যাংকটি ঋণগ্রহীতা বা অন্য কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান হতে আমানত সংগ্রহ করতে পারবে।
ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী গ্রামীণ ব্যাংকসহ বিভিন্ন এনজিও শুধুমাত্র ঋণগ্রহীতা সদস্যদের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করে থাকে। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) আইনে এসব প্রতিষ্ঠান ঋণগ্রহীতা সদস্যদের বাইরে অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে আমানত সংগ্রহ করতে পারে না।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন হবে ৫০০ কোটি টাকা, যা ১০০ টাকা মূল্যমানের ৫ কোটি শেয়ারে বিভক্তি থাকবে। এর পরিশোধিত মূলধন হবে কমপক্ষে ২০০ কোটি টাকা, যা ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডার ও অন্যান্য শেয়ারহোল্ডাররা পরিশোধ করবেন।
এর মধ্যে ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের মূলধনের পরিমাণ হবে কমপক্ষে ৬০%, যা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর ক্রমান্বয়ে পরিশোধযোগ্য হবে। অর্থাৎ, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার পর এই ব্যাংক থেকে যারা ঋণ নেবেন, তারা পরবর্তীতে ১০০ টাকা মূল্যমানের শেয়ার কিনে ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডার হবেন।
অধ্যাদেশে সামাজিক ব্যবসা সম্পর্কে বলা হয়েছে, এটি এমন একটি সামাজিক উদ্যোগ, যার মূল উদ্দেশ্য সামাজিক সমস্যার সমাধান করা এবং যাতে বিনিয়োগকারীরা কেবল তাদের মূল অর্থ ফেরত পাবেন, তবে কোন মুনাফা পাবে না। যেসব প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ ২৫ জন জনবল এবং ১.৫০ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে, সেগুলোকে ক্ষুদ্র উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এতে।
ব্যাংকটি নিম্ন আয়ের ব্যক্তি ও প্রচলিত ব্যাংকিং সেবা বহির্ভূত ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষুদ্রঋণ, সঞ্চয় ও বীমা জাতীয় আর্থিক পরিষেবা দেওয়ার মাধ্যমে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে মূলধন তৈরি ও উদ্যোগের শুরুতে ক্ষমতায়নের মাধ্যমে দারিদ্র দূর করবে।
ঋণ আদায়ের নিয়মাবলী
নতুন এই ব্যাংকটির কোনো ঋণগ্রহীতা খেলাপি হলে তাকে ১৫ দিনের নোটিশ না দিয়ে খেলাপি ঋণ আদায় কার্যক্রম শুরু করা যাবে না।
খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের শর্ত সাপেক্ষে ঋণ পুনঃতফসিল করা, পুনগর্ঠন বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারবে। এতেও খেলাপি আদায়ে সন্তোষজনক অগ্রগতি না হলে অর্থঋণ আদালত আইনসহ প্রচলিত অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে ব্যাংক।
তবে খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংক জবরদস্তি করা যাবে না উল্লেখ করে অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, 'খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক স্বচ্ছতা, সামাজিক সংবেদনশীলতা এবং ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় গ্রহণ করবে এবং জবরদস্তি বা হয়রানিমূলক, অবমাননাকর বা মানব মর্যাদা পরিপন্থি কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারবে না।'
লভ্যাংশের ব্যবহার এবং পরিচালনা কাঠামো
ব্যাংকটি সামাজিক ব্যবসায় পরিচালিত হওয়ায় এর বিনিয়োগকারীরা যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করবেন, ব্যাংকটির লভ্যাংশ থেকে সেই পরিমাণ অর্থ ফেরত পাবেন। ব্যাংক অতিরিক্ত মুনাফা করলে তা সংরক্ষিত তহবিলে রেখে তা সামাজিকখাতে ব্যবহার করা হবে।
ব্যাংকটি পরিচালনার জন্য ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ মোট ১০ সদস্যের পর্ষদ থাকবে। এর মধ্যে ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্য থেকে ৪ জন, অন্যান্য শেয়ারহোল্ডারদের মধ্য থেকে ৩ জন এবং বাংলাদেশ ব্যাংক মনোনিত ২ জন স্বতন্ত্র পরিচালক থাকবেন।
পরিচালকদের মধ্য থেকে একজন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ভোটাধিকার থাকবে না।
