দেশীয় স্পিনিং শিল্প রক্ষায় শুল্কমুক্ত সুতা আমদানির সুবিধা বাতিলের উদ্যোগ সরকারের
স্থানীয় স্পিনিং শিল্পকে সুরক্ষা দিতে বড় নীতিগত পরিবর্তনের পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে দীর্ঘ কয়েক দশকের পুরনো শুল্কমুক্ত সুতা আমদানির সুবিধা বাতিল করা হচ্ছে। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে কাঁচামাল হিসেবে সুতা আমদানির ওপর কর বেড়ে প্রায় ৩৭ শতাংশে দাঁড়াতে পারে।
স্থানীয় সুতা উৎপাদনকারী টেক্সটাইল মিলগুলোকে রক্ষার স্বার্থে গত ১২ জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত সুতা আমদানি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) অনুরোধ জানিয়েছে। অবশ্য এনবিআর ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেনি। তবে প্রস্তাবটি ইতিমধ্যে দেশীয় টেক্সটাইল মিল মালিক ও রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক উৎপাদনকারীদের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন তৈরি করেছে।
স্থানীয় স্পিনারদের জন্য 'লাইফলাইন'
দেশের টেক্সটাইল মিল মালিকরা এ খাতে প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছেন। তাদের দাবি, শিল্পটিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্যমতে, সুতার চাহিদা কমে যাওয়ায় ইতিমধ্যে প্রায় ১০০ মিল আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
এনজেড অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালেউদ জামান খান জিতু বলেন, 'এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে ২৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের স্থানীয় টেক্সটাইল মিলগুলোর টিকে থাকার সুযোগ তৈরি হবে।'
তিনি আরও বলেন, ভারত সরকার বিভিন্ন ধরনের ভর্তুকি দেওয়ায় ভারতীয় রপ্তানিকারকরা নিজেদের অভ্যন্তরীণ বাজারের চেয়েও কেজিতে প্রায় ০.৩০ ডলার কম দামে বাংলাদেশে সুতা বিক্রি করছে।
ইসরাক স্পিনিং মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল হক সংকটের তীব্রতা তুলে ধরে বলেন, 'চাহিদা কমে যাওয়ায় আমাদের এখন ৩ হাজার টন সুতা স্টকপাইল হয়ে আছে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে এর পরিমাণ থাকত সর্বোচ্চ ৭০০ টন। সরকার আমদানি নিয়ন্ত্রণ করলে আমাদের সুতার চাহিদা বাড়বে।'
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত থেকে, যার মধ্যে নিটওয়্যার পণ্য প্রায় ৫৪ শতাংশ। নিটওয়্যার উৎপাদনে মূলত ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা বেশি ব্যবহৃত হয়—আর এই সুতা আমদানির ওপরই মূলত বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকার (প্রায় ২.২২ বিলিয়ন ডলার) সুতা আমদানি করেছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানিকৃত সুতার প্রায় ৯০ শতাংশই আসে ভারত থেকে। অভিযোগ রয়েছে, ভারত সরকার রপ্তানিতে ভর্তুকি দেওয়ায় তাদের রপ্তানিকারকরা ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারের তুলনায় প্রতি কেজিতে প্রায় ০.৩০ ডলার কম মূল্যে বাংলাদেশে সুতা বিক্রি করতে পারছে।
বিটিএমএ বলছে, শুল্কমুক্ত আমদানি ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় উৎপাদনকারীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, অর্ডার কমে যাওয়ায় ইতিমধ্যে প্রায় ১০০টি টেক্সটাইল মিল আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
এনবিআরকে দেওয়া চিঠিতে বানিজ্য মন্ত্রণালয় যুক্তি তুলে ধরে বলেছে, গত দুই বছরে বন্ড সুবিধায় সুতা আমদানি ব্যপকভাবে বেড়েছে। ফলে দেশে উৎপাদিত সুতার বিক্রি ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এতে স্থানীয় সুতা উৎপাদনকারীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
চিঠিটা বলা হয়, এই ধারা অব্যাহত থাকলে আরও অনেক স্পিনিং মিল বন্ধ হওয়ার উপক্রয়ম হবে। এতে অদূর ভবিষ্যতে নিটওয়্যার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এর ফলে পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস, লিড টাইম বৃদ্ধি, স্থানীয় মূল্য সংযোজনের পরিমাণ কমে যাওয়া ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাবে।
আরএমজি নেতাদের উদ্বেগ
তবে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতের নেতারা সরকারের এই সিদ্ধান্তে উদ্বেগ জানিয়েছেন। বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) বলছে, এই পদক্ষেপ হবে 'আত্মঘাতী'।
বিকেএমইএ-র নির্বাহী সভাপতি ফজলী শামীম এহসান অভিযোগ করেন, কিছু দেশীয় সুতা উৎপাদনকারী ইতিমধ্যে প্রোফর্মা ইনভয়েস (পিআই) দিতে দেরি করে চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করেছে।
শিল্প নেতাদের ধারণা, শুল্কমুক্ত আমদানি বন্ধ হলে সুতার দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে। বর্তমানে প্রতি কেজি সুতার দাম ২.৫৫ থেকে ২.৬০ ডলার, যা বেড়ে ২.৮৫ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
বিজিএমইএর সহ-সভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী বলেন, 'আমাদের রপ্তানি সক্ষমতা এখন ঝুঁকির মুখে। এমন এক সময়ে শুল্ক বসতে যাচ্ছে, যখন সারা বিশ্বে পোশাকের চাহিদা প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে। গত পাঁচ মাস ধরে রপ্তানিও কমছে। বাড়তি উৎপাদন খরচ ক্রেতার কাছ থেকে নেওয়া যাবে না। ফলে আমাদের পোশাক খাত আরো পেছনের দিকে যাবে।'
নিজেদের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ আজ এক যৌথ সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেছে।
সুতার দাম বাড়তে পারে ১০ শতাংশ
বর্তমানে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুতা কেজিতে ২.৭০ থেকে ২.৭৫ ডলার দরে বিক্রি হচ্ছে। বিপরীতে আমদানি করা ভারতীয় সুতার দাম পড়ছে ২.৫৫ থেকে ২.৬০ ডলার।
সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, আমদানি বিধিনিষেধ কার্যকর হলে সুতার দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি ২.৮০ থেকে ২.৮৫ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে।
