গ্রামাঞ্চলের দারিদ্র্য হ্রাসে অগ্রগতি শহরের চেয়ে দ্রুত: বিশ্বব্যাংক
২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে গ্রামীণ এলাকা শহরাঞ্চলকে ছাড়িয়ে গেছে—মূলত কৃষির শক্তিশালী পুনরুত্থানের কারণে। আজ মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত 'বাংলাদেশের দারিদ্র্য ও বৈষম্য মূল্যায়ন ২০২৫' প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক এই পরিবর্তন আগের প্রবণতার বিপরীত এবং এর ফলে গ্রাম–শহরের বৈষম্য আরও বেড়েছে। দেশের মোট দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে শহরাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের হার ক্রমেই বাড়ছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের ছয় বছরে গ্রামীণ দারিদ্র্য কমেছে ৮.৫ শতাংশীয় পয়েন্ট, যা শহরের দারিদ্র্য হ্রাসের হার (৪.৬ শতাংশীয় পয়েন্ট)-এর প্রায় দ্বিগুণ। বিশ্বব্যাংকের মতে, গ্রামীণ এলাকায় ভোগব্যয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী এবং দারিদ্র্যবান্ধব—যা দারিদ্র্য বিমোচনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে অন্যতম কারণ ছিল তিনটি প্রধান অর্থনৈতিক খাতের ভিন্ন ভিন্ন পারফরম্যান্স। ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে কৃষি খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে ১.৪ শতাংশীয় পয়েন্ট, বিপরীতে শিল্প ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি কমেছে যথাক্রমে ১.১ এবং ০.২ শতাংশ পয়েন্ট।
কর্মসংস্থানেও কৃষি খাত ছিল সর্বোচ্চ অবদানকারী—২০২২ সালে দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৪৫.৩ শতাংশ হয়েছে কৃষিতে; একই সময়ে মোট নতুন কর্মসংস্থানের প্রায় ৮০ শতাংশও এসেছে কৃষি থেকে।
গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাসে কৃষিনির্ভর পরিবারের অবদান ছিল অর্ধেক। ২০১০–২০১৬ সময়ে এই অবদান ছিল মাত্র ৩০ শতাংশ, যখন শিল্প ও সেবা খাত দারিদ্র্য হ্রাসের মূল চালিকাশক্তি ছিল।
অন্যদিকে ২০১৬–২০২২ সময়ে শিল্প ও সেবা খাতের সম্মিলিত অবদান কমে দাঁড়ায় ৪৬ শতাংশ, এবং শুধু সেবা খাতের অবদানই কমেছে পাঁচ শতাংশীয় পয়েন্ট।
বিশ্বব্যাংক বলছে, কৃষিনির্ভর কর্মসংস্থান বৃদ্ধির (বার্ষিক গড় ২.৩ শতাংশ, অর্থাৎ বছরে ১৪ লাখ চাকরি) ফলে শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণও বেড়েছে।
এই সময়ে গ্রামীণ অঞ্চলে বৈষম্য কিছুটা কমেছে—গ্রামীণ গিনি সহগ ২৯.২ থেকে নেমে ২৮.২ হয়েছে। তবে শহরাঞ্চলে বৈষম্য বেড়েছে—শহরের গিনি সহগ ৩৩.১ থেকে বেড়ে ৩৪.৫। সাধারণত গিনি সহগ দিয়ে একটি দেশে আয়বৈষম্য কেমন, তা বিশ্লেষণ করা হয়।
গ্রামে দারিদ্র্য দ্রুত কমায় দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীতে শহরের অংশ বেড়েছে। ২০২২ সালে দেশের প্রতি চারজন দরিদ্র মানুষের একজন ছিলেন শহরে। যদিও দারিদ্র্যের হার গ্রামে এখনও বেশি—২০.৫ শতাংশ, সে তুলনায় শহরে ১৪.৭ শতাংশ।
প্রতিবেদনটি বলছে, একসময় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ইঞ্জিন হিসেবে বিবেচিত শহরাঞ্চল সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মন্থর হয়ে পড়ে—শিল্প খাতে নতুন চাকরির সৃষ্টি কমে যাওয়া এবং বহু শহুরে পরিবারের আয় স্থবির হয়ে পড়ার কারণে।
বেতন, রেমিট্যান্স এবং সম্পদ মালিকানায় বৈষম্য বাড়ায় শহরাঞ্চলের অসমতা আরও তীব্র হয়েছে, যা গ্রাম–শহরের বিভাজনকে বাড়িয়ে তুলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
